Home / বায়োটেকনলজি / স্মৃতির সংকেতায়ন

স্মৃতির সংকেতায়ন

মূল নিবন্ধ: The Memory Code
সূত্র: Scientific American, July 2007
লেখক:
Joe Z. Tsien; অধ্যাপক, ফার্মাকোলজি ও বায়োমেডিকেল প্রকৌশল এবং পরিচালক, সেন্টার ফর সিস্টেম্‌স নিউরোবায়োলজি; বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়।

ভূমিকম্পের কবলে পড়েছেন এমন যে কারো মনে এর জ্বলজ্যান্ত স্মৃতি থেকে যায়: ভিত্তিভূমির সেই প্রগাঢ় কম্পন, ঝাঁকুনি, উত্থান এবং পতন; গুড়গুড় শব্দে ভারী হয়ে উঠা সেই বাতাস, ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া কাঁচ; আসবাবপত্রের মুক্তভাবে উড়ে যাওয়া; সাজানো তাক থেকে বই এবং বাসনপত্রের নিচে পড়ে যাওয়ার হিরিক সব মিলিয়ে এক অন্তিম বিভীষীকা। জীবনের এই ঘটনাগুলো আমাদের সুস্পষ্টভাবেই অনেকদিন পর্যন্ত মনে থাকে, কারণ আমাদের মস্তিষ্ক ঠিক এ ধরণের কাজ করার জন্যই বিবর্তিত হয়েছে। এর কাজ হচ্ছে জীবনের প্রধান ঘটনাগুলো থেকে পর্যাপ্ত তথ্য নিংড়ে তুলে আনা এবং সেই জ্ঞান ব্যবহার করে ভবিষ্যতে একই ধরণের ঘটনার প্রেক্ষিতে আমাদের উদ্দীপনাকে পরিচালনা করা। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়ার এই যোগ্যতাই সকল প্রাণীকে এই জটিল এবং স্বতঃপরিবর্তনশীল জগতের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।

কয়েক দশক জুড়ে স্নায়ুবিজ্ঞানীরা মস্তিষ্ক কিভাবে স্মৃতি তথা মেমোরি সৃষ্টি করে সে রহস্যের জট খোলার চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। অধুনা, কয়েকটি অভিনব পরীক্ষণ ও শক্তিশালী গাণিতিক বিশ্লেষণ এবং একই সাথে একটি জাগ্রত ইঁদুরের মস্তিষ্কের ২০০টি নিউরনের কার্যক্রিয়া রেকর্ড করার ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে আমি এবং আমার সহকর্মীরা মিলে একটি বিশেষ আবিষ্কার পৃথিবীকে উপহার দিতে সমর্থ হয়েছি। যে প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞতা থেকে মূল তথ্যটি মস্তিষ্ক গ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে তাকে স্মৃতিতে পরিণত করে তার মৌলিক কৌশল আমরা আবিষ্কার করতে পেরেছি। আমাদের প্রাপ্ত ফলাফল আরও বিস্তারিত গবেষণা কর্মের দাবী নিয়ে এসেছে। এই ফলাফল আরও নির্দেশনা দেয় যে, একটি নিউরন থেকে আরেকটি নিউরনে সংকেতের যে রৈখিক প্রবাহ বিদ্যমান তা মস্তিষ্কের ধারণা এবং স্মৃতি সংরক্ষণ প্রক্রিয়া ব্যাখ্যার জন্য যথেষ্ট নয়। বরঞ্চ, এটি ব্যাখ্যার জন্য প্রচুর সংখ্যক নিউরনের সমন্বিত কার্যক্রিয়ার প্রয়োজন হয় বলে প্রতিভাত হয়েছে।

এরই সাথে আমাদের গবেষণার ফলে প্রতীয়মান হয়েছে যে, স্মৃতিকে সংকেতায়িত করার কাজে রত নিউরোনাল পপুলেশন (এ কাজে নিয়োজিত সকল নিউরনঘটিত উপাদানসমূহ) একই সাথে এক ধরণের সাধারণীকৃত ধারণা নিংড়ে নিয়ে আসে যা আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে জ্ঞান এবং আদর্শে রুপান্তরিত করতে সাহায্য করে। আমাদের অনুসন্ধান জীববিজ্ঞানীদেরকে সর্বজনীন নিউরাল সংকেতের পাঠোদ্ধারের কাজে আরও সুসংহত করতে পেরেছে। যে সমস্ত নীতিমালার অনুসরণের মাধ্যমে মস্তিষ্ক একগুচ্ছ বৈদ্যুতিক তাড়নাকে ধারণা, স্মৃতি, জ্ঞান এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে আচারে রুপান্তরিত করে তার পাঠোদ্ধারই এখানে বিবেচ্য। এই বোধটি অনুসন্ধান পরিচালনাকারীদেরকে অধিক উন্নত আগাগোড়া বোনা একক মস্তিষ্কভিত্তিক যন্ত্রের ইন্টারফেস তৈরী, সম্পূর্ণ নতুন প্রজন্মের অধিক চটপটে কম্পিউটার ও রোবটের নকশা প্রণয়ন এবং সম্ভবত মনের সকল সংকেতের একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। আর এই সংগ্রহশালা সকল ধরণের নিউরনঘটিত কার্যক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সংকেতের পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হবে এবং তদুপরি বুঝতে পারবে একজন মানুষ কি মনে রাখে এবং কি চিন্তা করে।
ডুগি কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল

শিক্ষা গ্রহণ এবং স্মৃতি সংরক্ষণের আনবিক ভিত্তি নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে মস্তিষ্কের সংকেত পাঠোদ্ধার বিষয়ে আমাদের গ্রুপের গবেষণার গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৯৯ সালের শরতে আমরা একটি বিশেষ জাতের ইঁদুর তৈরী করি যা সাধারণের চেয়ে উন্নতমানের স্মৃতি ধারণে পারদর্শী ছিল। [দেখুন: "Building a Brainier Mouse", by Joe Z. Tsien; Scientific American, April 2000] ১৯৯০-এর দশকের প্রথমদিককার জনপ্রিয় টিভি ড্রামেডি "ডুগি হাউসার"-এ তরুণ ডাক্তারটির নাম ছিল ডুগি; এর নামানুসারেই আমরা এই স্মার্ট ইঁদুরটির ডাকনাম দেই ডুগি। বুনো জাতের ইঁদুর অপেক্ষা ডুগি অধিক দ্রুত শিখতে পারে এবং বিভিন্ন বিষয় অপেক্ষাকৃত বেশি সময় ধরে মনে রাখতে পারে। এই কর্মটি বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং বিতর্কের সূচনা ঘটায়, এমনকি একে নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ নিবন্ধও লেখা হয়। কিন্তু আমাদের এই অনুসন্ধানটি আমার মনে বারংবার একই প্রশ্নের উদয় ঘটায়, তা হল, স্মৃতি প্রকৃতপক্ষে কি?

বিজ্ঞানীরা জানতেন, চিরন্তন অভিজ্ঞতাকে দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিতে পরিণত করতে মস্তিষ্কের একটি অঞ্চলের প্রয়োজন হয় যার নাম "হিপোক্যাম্পাস"। এমনকি আমরা এ-ও জানতাম, এই প্রক্রিয়ায় কোন অণুটি বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। এ ধরণের একটি অণুর নাম এনএমডিএ গ্রাহক যার কিছু পরিবর্তন সাধনের মাধ্যমেই আমরা ডুগি তৈরী করেছিলাম। কিন্তু কেউ তখনও জানতো না, ঠিক কিভাবে মস্তিষ্কের স্নায়ু কোষগুলোর কার্যক্রিয়া স্মৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। (অর্থাৎ কোষগুলো জানলেও এর কার্যক্রিয়ার প্রতিনিধিত্ব সম্বন্ধে আমরা কিছু জানতাম না) কয়েক বছর আগে আমি বিস্ময়ভরে ভাবতে শুরু করেছিলাম যে, যদি আমরা স্মৃতির স্বরুপকে গণিত বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে পারতাম! আমরা কি এর সাথে সংশ্লিষ্ট গতিশীল নিউরাল নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করতে পারবো অথবা পারবো কি একটি স্মৃতি গঠিত হওয়ার সময় সংগঠিত কার্যক্রিয়াদি প্রত্যক্ষ করতে? এবং একটি অভিজ্ঞতার একেবারে মূল তথ্যাদির নির্যাসকে উদ্ধার করার ক্ষেত্রে নিউরোনাল পপুলেশনকে যে গাঠনিক মূলনীতিগুলো পরিচালিত করে তা উপলব্ধি করতে কি আমরা সক্ষম হবো?

স্মৃতি সংরক্ষণ ও তৈরীর কাজে নিযুক্ত নিউরাল সংকেত সম্বন্ধে কিছু জানতে হলে প্রথমে আমাদেরকে আরও উন্নত মানের মস্তিষ্ক-নিরীক্ষণ যন্ত্রের নকশা করতে হবে। আমরা ইঁদুর নিয়েই আমাদের কাজকর্ম চালিয়ে যেতে চাইছিলাম, যেন এর প্রেক্ষিতে একসময় শেখা ও মনে রাখার যোগ্যতায় জিনগতভাবে পরিবর্তিত প্রাণী নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষণ পরিচালনা করতে পারি। যেমন, আমাদের সে সময়কার পরীক্ষার উপকরণ ছিল ডুগি নামের চটপটে ইঁদুর এবং আগে থেকেই দুর্বল করে দেয়া স্মৃতি সম্পন্ন কিছু মিউট্যান্ট (যাদের পরিব্যক্তি সাধিত হয়েছে) ইঁদুর। গবেষকরা জাগ্রত ইঁদুরের শত শত নিউরনের কার্যক্রম নিরীক্ষণ করছিলেন, কিন্তু ইঁদুরের এসকল তথ্যের অনুসন্ধানকারীরা একই সময়ে একসাথে মাত্র ২০ থেকে ৩০টি কোষের তথ্য রেকর্ড করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কারণ ইঁদুরের মস্তিষ্কের আকার একটি বাদামের চেয়ে বড় কিছু নয়। এহেন পরিস্থিতিতে আমার গবেষণাগারের একজন অধি-ডক্টরেট ফেলো লংনিয়ান লিন এবং আমি এমন একটি রেকর্ডিং যন্ত্র তৈরী করি যার সাহায্যে একই সাথে জাগ্রত এবং স্বাধীন আচারে সক্ষম ইঁদুরের মধ্যস্থিত আরও অধিক সংখ্যাক বিচ্ছিন্ন নিউরনের কার্যক্রম নিরীক্ষণ করা যায়।

এরপর আমরা পরীক্ষণের নকশা প্রণয়ন করি যা মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অবস্থার সুবিধা গ্রহণে সক্ষম হয়। যে নাটকীয় ঘটনাগুলো একজন মানুষের জীবনে বিশেষ প্রভাব রাখে সেগুলোর স্মৃতি মস্তিষ্ক যেভাবে জমা করে তা বুঝতে পারার সুবিধাটিই আমি বুঝাতে চাচ্ছি। যারা ৯/১১ -এর সন্ত্রাসী হামলা প্রত্যক্ষ করেছেন বা কোন ভূমিকম্পের কবল থেকে বেচে গিয়েছেন বা ডিজনির টাওয়ার অফ টাওয়ারের ১৩টি তলা ওলন দিয়ে মাপার চেষ্টা করেছেন তাদের জীবনে এই ঘটানাগুলো ভুলে যাওয়াটা সত্যিই বেশ কষ্টকর। সুতরাং আমরা এমন কিছু পরীক্ষণ তৈরী করি যা এ ধরণের আবেগঘন ঘটনার একটি অনুকরণমূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। এই পরীক্ষণগুলোর ফলে প্রাণীর মনে সৃষ্ট স্মৃতি অধিক দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী হয়। এবং তখন আমাদের ধারণামতে হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলে এই ঘটনা সংকেতায়িত করতে আরও অধিক সংখ্যাক কোষ ক্রিয়াশীল হবে। ফলে অভিজ্ঞতাটির মাধ্যমে যে কোষগুলো কাজ করতে বাধ্য হয়েছে তাদেরকে আমরা সহজে খুঁজে পাবো এবং এই প্রক্রিয়ার চালিকাশক্তি হিসেবে ক্রিয়াশীল মূলনীতিগুলো এবং সংশ্লিষ্ট যেকোন গড়নের যথেষ্ট উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারবো।

যে প্রভাবশালী ধারাবাহিক ঘটনাগুলো আমরা পছন্দ করেছিলাম তার মধ্যে আছে, ভূমিকম্পের একটি গবেষণাগার সংস্করণ (একটি ইঁদুরকে ধারণকারী আধারকে নাড়ানোর মাধ্যমে), প্রাণীর পিছন দিক থেকে হঠাৎ করে তীব্র বায়ুর হলকা প্রদান (আকাশ থেকে একটি পেঁচা ইঁদুরকে আক্রমণ করেছে, এ ধরণের ঘটনার অনুকরণ) এবং একটি ছোট এলিভেটরের মধ্যে সামান্য উচ্চতা থেকে প্রাণীকে ফেলে দেয়া (প্রথম যখন পরীক্ষা শুরু করেছিলাম তখন একটি কুকি জারের মাধ্যমে এই এলিভেটর তৈরী করা হয়েছিল)। প্রত্যেক প্রাণীকে প্রতিটি ঘটনার সাতটি পর্বের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে দেয়া হয়েছিল এবং প্রতিটি ঘটনার মধ্যে কয়েক ঘন্টার বিরতি দেয়া হয়েছিল। ঘটনা সংগঠন এবং মধ্যবর্তী বিরতি- প্রতিটি সময়েই আমরা প্রাণীর হিপোক্যাম্পাসের সিএ১ নামক অঞ্চলের ২৬০টি কোষের কার্যক্রমের রেকর্ড নেই। প্রাণী এবং সকল মানুষের ক্ষেত্রেই সিএ১ এলাকাটি স্মৃতি সংগঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিস্ময়কর নমুনা ও গড়নসমূহ

উপাত্ত সংগ্রহের পর প্রথমেই আমরা এমন একটি নমুনা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলাম যা এই প্রভাবশালী ঘটনাগুলোর স্মৃতি সংকেতায়নের কাজ করতে পারে। রেমুস ওসান (অন্য একজন অধি-ডক্টরাল ফেলো) এবং আমি শক্তিশালী নমুনা চিহ্নিতকরণ পদ্ধতির মাধ্যমে এই রেকর্ডগুলোর বিশ্লেষণ করেছিলাম। আমরা বিশেষত মাল্টিপ্‌ল ডিসক্রিমিন্যান্ট অ্যানালাইসিস তথা এমডিএ পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলাম। এক্ষেত্রে গাণিতিক পদ্ধতিসমূহ ধ্বসে পড়ে এবং অধিক সংখ্যাক মাত্রার জন্য তা প্রভূত সমস্যার কারণ হয়। অধিক মাত্রার উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, একটি ঘটনা সংঘটনের আগে এবং পরে মিলে মোট ২৬০ টি কোষের কার্যক্রমের মাধ্যমে সৃষ্ট মোট মাত্রার সংখ্যা দাড়ায় ৫২০-এ। মাত্র তিন মাত্রার একটি গ্রাফিক্যাল লেখের মাধ্যমে এই সবগুলো মাত্রার বহিঃপ্রকাশ যে দুঃসাধ্য তা বলাই বাহুল্য। দুঃখজনক হলেও সত্য, ধ্রুপদী ধারায় শিক্ষিত জীববিজ্ঞানীদের ধারণামতে, নিউরোনাল কার্যক্রমের স্পর্শকীয় পরিমাপের (tangible mesurement) জন্য অক্ষ কোন ভূমিকা রাখেনা, যদিও এই অক্ষগুলোই বিভিন্ন ঘটনার দ্বারা উৎপাদিত বিচ্ছিন্ন নমুনাসমূহের মধ্যে বিভাজনরেখা টেনে দিতে সক্ষম একটি গাণিতিক সাবস্পেসের মানচিত্র প্রস্তুত করতে পারে।

একটিমাত্র প্রাণী থেকে রেকর্ডকৃত সকল নিউরনের প্রতিক্রিয়ার সংগ্রহ যখন আমরা একটি ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্রে স্থাপন করি তখন, চারটি ভিন্ন ভিন্ন নেটওয়ার্ক কার্যক্রমের কল্পিত রূপ বেরিয়ে আসে: একটি বিশ্রামরত মস্তিষ্কের অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট, একটি ভূমিকম্পের সাথে, একটি বায়ুর হলকার সাথে এবং অপর একটি এলিভেটরের ভিতরে উল্লম্ব পতনের সাথে সংশ্লিষ্ট। এ হিসেবে, আমাদের আবেদনময়ী প্রতিটি ঘটনাই সিএ১ অঞ্চলের নিউরাল সমাবেশে ভিন্ন ভিন্ন নমুনার জন্ম দিয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, এই নমুনাগুলো ঘটনার চিরন্তন, আবেগময়ী এবং বাস্তবভিত্তিক ভাবগুলোর সকল তথ্যের একতাবদ্ধ রূপের প্রতিনিধিত্ব করে।

প্রাণীগুলো যখন বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে থাকে সেই গতিশীল অবস্থায় নমুনাগুলো কিভাবে বিবর্তিত হয় তা দেখার জন্য আমরা এরপর একটি "স্লাইডিং উইন্ডো" কৌশল প্রয়োগ করি। প্রতিটি প্রাণী থেকে প্রাপ্ত ঘন্টাব্যাপী রেকর্ডগুলোতে এই কৌশল প্রয়োগ করা হয়। প্রতিটি মুহূর্তের জন্য আমরা রেকর্ডগুলোর মধ্য দিয়ে উইন্ডো সরিয়ে নিতে থাকি (অর্থাৎ একটি মুহূর্তের রেকর্ড উইন্ডোতে সংকেতায়নের পর তা সরিয়ে নিয়ে আরেকটি উইন্ডো স্থাপন করা হয়) এবং এই সরিয়ে নেয়ার প্রতিটি মুহূর্তে এমডিএ বিশ্লেষণের পুনরাবৃত্তি করি। প্রতিটি উইন্ডো ছিল অর্ধ সেকেন্ডের। এর ফলে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, ঘটনা ঘটার প্রেক্ষিতে প্রাণীগুলো যখন তার স্মৃতি মস্তিষ্কে স্থাপন করতে থাকে তখন প্রতিক্রিয়ার (response) এই নমুনাগুলো কিভাবে একটির পর আরেকটি পরিবর্তিত হয়। একটি প্রাণীতে যদি আমরা উদাহরণস্বরুপ ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতার কথা বিবেচনা করি তাহলে দেখবো, এনসেম্ব্‌লকরণের (সংকেতায়নের জন্য সুসংগঠিত করা) এই কার্যক্রম বিশ্রাম অঞ্চলের বুদ্‌বুদ থেকে শরু হয়ে ভূমিকম্প বুদ্‌বুদের মধ্যে দ্রুত নিক্ষিপ্ত হয় এবং আবার বিশ্রাম অবস্থায় ফিরে আসে। এই কার্যক্রমের লেখ অনেকটা বৈশিষ্ট্যমূলক ত্রিভুজ আকৃতির একটি প্রাস তৈরী করে।

সময় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এই বিশ্লেষণগুলো আরও বিস্ময়কর কয়েকটি তথ্য প্রকাশ করে: তাৎক্ষণিক আন্দোলন সৃষ্টিকারী এই অভিজ্ঞতাগুলোর সাথে সম্পর্কিত কার্যক্রিয়ার নমুনাসমূহ মূল ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর প্রতি সেকেন্ড থেকে মিনিটের ব্যবধানে আবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্মৃতিতে উদিত হচ্ছিল (অর্থাৎ সিএ১ অঞ্চলে একই নমুনা ফিরে আসছিল)। পুনরায় উদিত হওয়া এই নমুনাগুলোর এনসেম্ব্‌লকৃত ফলাফল আগের মতোই প্রাস তৈরী করেছে এবং এর মধ্যেও সেই বৈশিষ্ট্যমূলক জ্যামিতিক আকৃতি লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু নতুন এই প্রতিক্রিয়াগুলোর বিস্তার তাদের মৌলিক প্রতিক্রিয়ার তুলনায় কম। কার্যক্রিয়ার নমুনাসমূহের এই পৌনঃপুনিকতা প্রমাণ করে, হিপোক্যাম্পস তন্ত্রের মধ্য দিয়ে ভ্রমণরত তথ্যগুলো মস্তিষ্কের স্মৃতির বর্তনীতে নিজেদেরকে উৎকীর্ণ করে নিয়েছিল। এবং আমরা ধরে নিতে পারি, পৌনঃপুনিকতাটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তার অভিজ্ঞতাগুলোকে স্মরণ করা ছাড়া আর কিছু নয়। স্মৃতি সংকেতায়নের নমুনাগুলোর পুনরায় স্বতঃস্ফূর্ত কার্যকারিতাকে পরিমাণ এবং গুণগতভাবে পরিমাপ করতে পারার এই যোগ্যতা আমাদের সামনে এক নতুন দুয়ার খুলে দেয়। এই দুয়ার পেরিয়ে আমরা যে জগতে প্রবেশ করি সেখানে, নবগঠিত স্মৃতিচিহ্নগুলো কিভাবে দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিতে পরিণত হয়ে নিরেট আকার ধারণ করে তা বুঝতে আর কোন অসুবিধা ছিলনা। এমনকি চটপটে ইঁদুর এবং শিখতে পারার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে এমন ইঁদুরের মস্তিষ্কে এই প্রক্রিয়াগুলো কিভাবে প্রভাবিত হয় তা বুঝতেও তখন আর বাঁধা ছিল না।

ক্লিকের শক্তি

সুনির্দিষ্ট স্মৃতির নির্দেশক এই নমুনাগুলো হাতে পাওয়ার পর আমরা বুঝাতে চেষ্টা করছিলাম, কিভাবে আমাদের হাতে পরীক্ষীত নিউরনগুলো একসাথে কাজ করে বিভিন্ন ঘটনা মস্তিষ্কে সংকেতায়িত করেছে। ওসান এবং আমি এ সময় আবিষ্কার করি, সকল নেটওয়ার্ক-স্তরের নমুনাগুলো নিউরোনাল পপুলেশনের বিচ্ছিন্ন সাবসেটের সম্মিলিত ক্রিয়ার দ্বারা উৎপাদিত হয়; আমরা এই সাবসেটের নাম দেই "নিউরোনাল ক্লিক"। উল্লেখ্য, আমাদের পূর্বতন পর্যানুক্রমিক এমডিএ পদ্ধতির সাথে হাইয়ারার্কিয়াল ক্লাস্টারিং অ্যানালাইসিস নামক একটি নতুন গাণিতিক প্রক্রিয়ার সমন্বয় ঘটিয়ে আমরা এটি আবিষ্কার করেছিলাম। ক্লিকের সংজ্ঞা এভাবে দেয়া যেতে পারে, "কিছু নিউরনের সমষ্টি যারা একটি চিহ্নিত ঘটনার প্রতি হুবহু একই প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে এবং একসাথে একটি সুসংহত সংকেতায়ন একক (robust coding unit) হিসেবে কাজ করে।"

আমরা আরও বুঝতে পেরেছিলাম, প্রতিটি সুনির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিনিধিত্ব করে নিউরাল ক্লিকের একটি করে সেট। নিউরাল ক্লিকের এই সেট সাধারণ থেকে সুনির্দিষ্ট ব্যাপ্তির মধ্যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে সংকেতায়িত করতে পারে। উল্লেখ্য, ভূমিকম্পের পর্বটির কারণে একটি সাধারণ আকস্মিক ক্লিক কাজ করা শুরু করে, একই সাথে দ্বিতীয় আরেকটি ক্লিক কেবলমাত্র গতির তারতম্য সংশ্লিষ্ট ঘটনায় সাড়া দেয়, তৃতীয় ক্লিকটি কেবলমাত্র কম্পন বা ঝাঁকুনির মাধ্যমে কার্যকর হয় এবং চতুর্থ ক্লিকটি নির্দেশ করে ঘটনাটি কোথায় সংঘটিত হয়েছে। প্রথম ক্লিকটি তিনটি আকস্মিক উদ্দীপনাতেই সাড়া দেয় আর দ্বিতীয় ক্লিকটি গতির যে তারতম্যের নির্দেশক হিসেবে কাজ করে তা ভূমিকম্প বা এলিভেটর মধ্যে পতন উভয় ঘটনার ক্ষেত্রেই একই আচরণ করে। প্রতিটি কম্পন প্রয়োগ করার আগে আমরা দুইটি ভিন্ন আধারের একেকটিতে প্রাণীটিকে রাখি। এভাবে ধারাবাহিক ঘটনাগুলো সম্বন্ধে প্রাপ্ত তথ্যাদির প্রতিনিধিত্ব করে নিউরাল ক্লিকের ভিন্ন ভিন্ন সমাবেশ। সাধারণ থেকে সুনির্দিষ্ট ব্যাপ্তিতে যেকোন নিউরাল ক্লিকই অপরিবর্তনীয় এবং সুসংহত রূপে সংগঠিত হয়। এই সুসংহত ব্যবস্থাটি ক্রমেই একটি বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত পিরামিডের আকৃতিতে বিন্যস্ত হয়ে পড়ে যার ভিত্তিভূমিতে অবস্থিত ক্লিকগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য (যেমন, আকস্মিক ঘটনা) সংকেতায়িত করে এবং যার চূড়ার দিকের ক্লিকগুলো সংকেতায়িত করে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্যাদি (যেমন, ঝাঁকুনি বা ব্ল্যাক বক্সের মধ্যকার কম্পন)।

হিপোক্যাম্পাসের সিএ১ অঞ্চল মস্তিষ্কের অনেকগুলো অঞ্চল এবং সংবেদী তন্ত্র থেকে ইনপুট গ্রহণ করে। খুব সম্ভবত ইনপুট যে অঞ্চল থেকে এসেছে তার বৈশিষ্ট্যের প্রভাবেই একটি প্রদত্ত ক্লিক কোন ধরণের তথ্য সংকেতায়িত করবে তা নির্ধারিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, যে ক্লিকটি তিনটি আকস্মিক ঘটনার প্রতিই সাড়া দেয় তা অ্যামিগডালা (amygdala – যে অঞ্চলটি ভয়, নতুনত্বের অভিজ্ঞতা বা অন্যান্য আবেগ প্রক্রিয়াজত করে) থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলোকে একীভূত করতে পারে। এ হিসেবে ক্লিকটি পরিশেষে সংকেতায়িত করে, "এই ঘটনাগুলোর সবগুলোই ভীতিপ্রদ এবং মর্মপীড়ক"। আবার যে ক্লিকটি ভূমিকম্প এবং এলিভেটরের মধ্যকার পতনের তথ্যাদির মাধ্যমে কার্যকর হয় তা ভেস্টিবুলার তন্ত্র থেকে প্রক্রিয়াজাত হয়ে আসে ইনপুট গ্রহণ করতে পারে। কারণ এই তন্ত্রটিই গতির তারতম্যের তথ্যাদি সরবরাহ করে। তাহলে, এই ক্লিক সংকেতায়িত করবে,"ঘটনাগুলোর কারণে আমি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছি"। অনুরূপভাবে, যে ক্লিকগুলো সুনির্দিষ্ট স্থানে সুনির্দিষ্ট একটি ঘটনার প্রতিই সাড়া দেয় তারা হয়তোবা ইনপুট পায় স্থানিক কোষগুলো (place cell) থেকে। স্থানিক কোষের নিউরনগুলো তখনই উদ্দীপ্ত হয়, যখন জীবটি তার পরিবেশে আগে থেকে পরিচিত সুনির্দিষ্ট কোন স্থান অতিক্রম করে। ফলশ্রুতিতে এবারকার ক্লিকটি সংকেতায়িত করে, "এই ভূমিকম্পটি কালো পাত্রের মধ্যে ঘটেছে"।

জ্ঞানের পথে যাত্রা

আমাদের আবিষ্কারগুলো স্মৃতির সংকেতায়নকে নিয়ন্ত্রণকারী মৌলিক সাংগঠনিক নীতি সম্বন্ধে বেশ কয়েকটি প্রস্তাবনা পেশ করে। প্রথমত, আমরা বিশ্বাস করি, নিউরাল ক্লিক স্মৃতি গঠনের ক্ষেত্রে কার্যকর সংকেতায়ন একক হিসেবে কাজ করে এবং এরা এতোটাই দৃঢ় যে মধ্যবর্তী বিচ্ছিন্ন কিছু নিউরন তাদের নির্দিষ্ট কাজের ব্যতিক্রম করলেও সামগ্রিকভাবে তা নির্দিষ্ট তথ্যটি উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়। নিউরাল পপুলেশন যে স্মৃতি এবং ধারণার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে এই চিন্তাটি নতুন কিছু নয়, কিন্তু আমরা মনে করি আমরাই প্রথম এর সপক্ষে পরীক্ষণমূলক উপাত্ত সংগ্রহ করতে পেরেছি। সংগৃহীত এসব তথ্য উন্মোচন করেছে কিভাবে নিউরাল পপুলেশনের অভ্যন্তরে এ ধরণের তথ্য সংগঠিত হয়। একই ঘটনার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য তথ্য আকারে নিংড়ে নিয়ে আসার জন্য মস্তিষ্ক স্মৃতি সংকেতায়নকারী ক্লিকের উপর নির্ভর করে। এবং সঙ্গত কারণেই মস্তিষ্ক নির্দিষ্ট একটি ঘটনার এই তথ্যগুলোকে পিরামিডের মধ্যে প্রাধান্যপরম্পরায় সজ্জিত করে। পিরামিডের ভিত্তিভূমির দিকে সবচেয়ে সাধারণ এবং উপরের দিকে সবচেয়ে নির্দিষ্ট তথ্যগুলো স্থান পায়। আমরা আরও বিশ্বাস করি, এমন ধরণের পিরামিডকে একটি বহুতলক ঘনবস্তুর উপাদান হিসেবে ধরে নেয়া যায়। সামগ্রিকভাবে এই বহুতলকটি একটি নির্দিষ্ট বিষয়শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত সকল ঘটনার প্রতিনিধিত্ব করে, যেমন, "সকল আকস্মিক ঘটনাসমূহ"।

স্মৃতি, প্রাধান্যপরম্পরায় একটি পিরামিডে সজ্জিত হয়ে সমাবেশের মাধ্যমে জটিল নেটওয়ার্ক তৈরী করে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মস্তিষ্ক প্রায় অসীম সংখ্যাক নেটওয়ার্ক স্তরের গড়ন তৈরী করতে পারে যারা অসীম সংখ্যাক অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। এভাবে একটি জীব তার জীবনে যত অভিজ্ঞতা লাভ করে তার সবগুলোই স্মৃতি আকারে সংরক্ষিত হয়। প্রক্রিয়াটি অনেকটা ডিএনএ'র মত। চারটি মাত্র বর্ণ (A, T, G, C) তথা নিউক্লিওটাইড বিভিন্নভাবে সজ্জিত হয়ে ডিএনএ অনু গঠন করে এবং এই নিউক্লিওটাইডগুলো অসীম সংখ্যক গড়ন তৈরী করার মাধ্যমে পৃথিবীতে এত বিচিত্র জীবের সৃষ্টি করে। এবং স্মৃতির সংকেতগুলো যেহেতু বিভিন্ন বিষয়শ্রেণীতে প্রাধান্যপরম্পরায় সজ্জিত হয় সেহেতু সম্পূর্ণ নতুন কোন অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করার উপযোগী সংকেত তৈরীতে খুব বেশি ঝক্কি পোহাতে হয়না, কেবল সেটি চিহ্নিত করার জন্য পিরামিডের উপরের দিকের ক্লিকগুলোকে প্রতিস্থাপিত করলেই হয়ে যায়। যেমন, ঝোপের পিছনে যে কুকুরটি ঘেউঘেউ করছে তা জার্মান শেফার্ড নায় হয়ে একটি পুড্‌লও হতে পারে অথবা ভূমিকম্পটি ইন্দোনেশিয়াতে না হয়ে ক্যালিফোর্নিয়াতেও হতে পারে।

আমরা এতোক্ষণে বুঝতে পেরেছি, স্মৃতি সংকেতায়নকারী পিরামিড অভিন্নভাবে এমন ধরণের ক্লিকগুলো অন্তর্ভুক্ত করে যারা বিভিন্ন তথ্যকে একটি বিমূর্ত রূপে এনে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়। এই বোধ আমাদেরকে এও বলে দেয়, মস্তিষ্ক একটি সাধারণ যন্ত্র মাত্র নয় যে, প্রতিটি ঘটনার বিস্তারিত বিষয়াদি সংরক্ষণ করে রাখবে। বরঞ্চ, স্মৃতির তন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত নিউরাল ক্লিকগুলো মস্তিষ্ককে ঘটনার কোন নির্দিষ্ট পর্বের কেবল অনন্য বৈশেষ্ট্যগুলোই সংকেতায়িত করতে সাহায্য করে। একই সাথে সেই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে কিছু সাধারণ তথ্য বের করে আনতেও সাহায্য করে যা ভবিষ্যতে এ ধরণের কোন ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হতে পারে। ভবিষ্যতের সেই ঘটনাটি হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বৈশিষ্ট্যে আগেরটির মতোই, কিন্তু বিস্তারিত ভৌত বৈশিষ্ট্যাদিতে ভিন্ন। সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোকে নতুন করে সংকেতায়িত করতে হবেনা। প্রাত্যহিক সব ঘটনা থেকে এভাবে বিমূর্ত জ্ঞান ও ধারণা তৈরীর ক্ষমতাই আমাদের বুদ্ধিমত্তার চাবিকাঠি যা আমাদেরকে নিয়ত পরিবর্তনশীল এই বিশ্বের নিত্য নতুন সব সমস্যা সমাধানে সক্ষম করে তোলে।

উদাহরণস্বরুপ, একটি "বিছানা" কল্পনা করা যাক। মানুষ পৃথিবীর যেকোন হোটেলের যেকোন কক্ষে গিয়ে অন্য মডেলের একটি বিছানা দেখলেও তাৎক্ষণিকভাবে তা চিহ্নিত করতে পারে যদিও সে সেই নির্দিষ্ট বিছানাটি আগে কখনও দেখেনি। স্মৃতি সংকেতায়ন প্রক্রিয়াটি যে আমাদেরকে কেবল একটি নির্দিষ্ট বিছানার চিত্র মনে করিয়ে রাখে তা-ই নয়, একইসাথে তা বিছানা কি তার একটি সাধারণ সংজ্ঞাও তৈরী করে দেয়। আমি এবং আমার সহকর্মী অন্তত ইঁদুরের মধ্যে এমনটি হতে দেখেছি। পরীক্ষাগুলো করার সময়ে আমরা অনেকটা কাকতালীয়ভাবেই স্বল্প সংখ্যক হিপোক্যাম্পাল নিউরন আবিষ্কার করি যেগুলো "নীড়" নামক বিমূর্ত ধারণাটির প্রতি সাড়া দেয় বলে মনে হয়েছিল। এই কোষগুলো প্রবলভাবে যেকোন ধরণ বা আকারের নীড়ের প্রতি সাড়া প্রদান করে, তা সে গোলাকার, বর্গাকার, ত্রিকোণাকার যে আকারেরই হোক না কেন বা সুতি বা প্লাস্টিক যে পদার্থেরই তৈরী হোক না কেন। আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছি, এই কোষগুলো নীড়ের নির্দিষ্ট কোন বৈশিষ্ট্যের প্রতি সাড়া দেয় না, অর্থাৎ এর আকার, প্রকার বা পদার্থের প্রতি সাড়া দেয়না। এটি কেবল কার্যক্রিয়ার প্রতিই সাড়া দেয়। সে কেবল বুঝে নিতে সাহায্য করে, নীড় এমন একটি স্থান যেখানে ঘুমানো যায়।

নিউরাল ক্লিকের সুনির্দিষ্ট শ্রেণীতে বিন্যস্ত এই ক্রমান্বয়িক সংগঠন প্রায়শই একটি সাধারণ কৌশলের প্রতিনিধিত্ব করে। আর এই কৌশলের মাধ্যমে ক্লিকগুলো কেবল স্মৃতি সংকেতায়িতই করেনা, একই সাথে হিপোক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থিত মস্তিষ্কের অন্যান্য অঞ্চলের বিভিন্ন ধরণের তথ্যাদিরও প্রতিনিধিত্ব করে। এই তথ্যাদি সংজ্ঞাবহ বা ইন্দ্রিয়জ ধারণা থেকে শুরু করে সচেতন চিন্তা ইত্যাদি যে কোন ধরণের হতে পারে। কিছু প্রমাণের মাধ্যমে আমরা ধরে করতে পারি এই প্রস্তাবনাটি সত্য। উদাহরণস্বরূপ, দর্শন তন্ত্রের (visual system) ক্ষেত্রে গবেষকরা এমন কিছু নিউরন আবিষ্কার করেছেন যারা মুখমণ্ডলের প্রতি সাড়া দেয়, এখন মুখমণ্ডল মানুষ, বানর যার-ই হোক না কেন। এমনকি মুখমণ্ডল আকৃতির কোন পাতা প্রতিও এরা সংবেদনশীল। অন্যরা এমন কিছু কোষ খুঁজে পেয়েছেন যারা মুখমণ্ডলের একটি নির্দিষ্ট উপসেটের প্রতি সাড়া দেয়। আবার হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলে ফিরে আসা যাক। মৃগী রোগীদের উপর গবেষণাকারী একদল গবেষক কোষের একটি নির্দিষ্ট উপসেট খুঁজে পেয়েছেন, যারা বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি দেখলে তাদের অগ্ন্যুৎপাতের হার বাড়িয়ে দেয়। লস এঞ্জেল্‌সে অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইজাক ফ্রাইড একটি চাঞ্চল্যকর পর্যবেক্ষণ করেছেন, এক রুগীর হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলের একটি নির্দিষ্ট কোষ কেবল অভিনেত্রী হেল বেরির প্রতিই সাড়া দেয়। হতে পারে এটি হেল বেরি ক্লিকের একটি অংশ! এই পর্যবেক্ষণগুলোকে একসাথে বিবেচনা করলে আমরা সমর্থন করতে বাধ্য হই যে, সাধারণ থেকে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের দিকে ক্রমান্বয়িকভাবে সংগঠিত তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এককগুলো একত্রে সমগ্র মস্তিষ্কের একটি সাধারণ সাংগঠনিক নীতির প্রতিনিধিত্ব করে।

স্মৃতিতে ১১০০১

ইঁদুর নিয়ে আমাদের গবেষণাগুলো এক মস্তিষ্ক থেকে অন্য মস্তিষ্কে বা মস্তিষ্ক থেকে কম্পিউটারে তথ্য স্থানান্তরের একটি উপায়ও বাতলে দিয়েছিল। ম্যাট্রিক্স ইনভারশন নামে পরিচিত গাণিতিক পদ্ধতিটি ব্যবহার করে আমরা নিউরাল ক্লিক সমন্বয়ের কার্যক্রমকে বাইনারি সংকেতের একটি স্ট্রিংয়ে অনূদিত করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এক্ষেত্রে, আমাদের পরীক্ষণ কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত একটি নির্দিষ্ট সমন্বয়ের অভ্যন্তরস্থ প্রতিটি সংকেতায়ন এককের জন্য ১ সক্রিয় অবস্থার এবং ০ নিষ্ক্রিয় অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করত। উদাহরণস্বরূপ, একটি ভূমিকম্পের স্মৃতিকে বাইনারিতে নিলে দাড়াতে পারে "১১০০১"। এখানে প্রথম ১ সাধারণ আকস্মিক ক্লিকের কার্যক্রিয়ার সূচনার প্রতিনিধিত্ব করে, দ্বিতীয় ১ হল গতির তারতম্যের প্রতি সাড়া প্রদানকারী ক্লিকের কার্যক্রিয়ার সূচনার প্রতিনিধিত্বকারী। এভাবে, প্রথম ০ মুখনিসৃত বায়ুপ্রবাহের কার্যক্রম কমে যাওয়ার ক্লিককে নির্দেশ করে, দ্বিতীয় ০ নির্দেশ করে এলিভেটর থেকে পতন সংশ্রিষ্ট ক্লিকের কার্যক্রিয়ার কমে যাওয়াকে এবং শেষ ১ ভূমিকম্প ক্লিকের কার্যক্রিয়ার সূচনা প্রদর্শন করে। চারটি ভিন্ন ভিন্ন ইঁদুরের নিউরাল সমন্বয়ের কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও আমরা একই ধরণের বাইনারি সংকেত প্রয়োগ করেছি। এই সংকেতগুলো দেখে তাদের কোনটি তোন ঘটনার অভিজ্ঞতা লাভ করেছে এবং কোথায় ঘটনাটি ঘটেছে তা বলে দেয়া সম্ভব হয়েছে। সংকেত দেখে আমরা যে ফরাফল উল্লেখ করেছি তা ছিল শতকরা ৯৯ ভাগ সঠিক। তাই বলা যায়, বাইনারি সংকেত স্ক্যান করার মাধ্যমে আমরা প্রাণীদের মন বুঝতে পারব এবং একের সাথে অন্যের তুলনাও করতে পারব।

এছাড়াও বাইনারি সংকেত, অবধারণ বা বোধ বিষয়ে গবেষণার জন্য একটি কার্যকর একীভূত কাঠামো গড়ে দিতে পারে। এই কাঠামো প্রাণীর বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে কাজ করতে পারে। উপরন্তু বাইনারি সংকেত মস্তিষ্কের তথ্যকে যন্ত্রের ভাষায় রুপান্তরের উপযোগী এমন যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করতে পারে যা দ্রুত ফল দেয়ার জন্য নিয়ত পরিবর্তনশীল উপাত্ত গ্রহণ ও তাৎক্ষণিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম হবে এবং কাজ করবে অবিচ্ছিন্নভাবে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা একটি পদ্ধতি তৈরী করেছি যা ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা অর্জন করছে এমন একটি ইঁদুরের নিউরাল কার্যক্রমকে এমন একটি বাইনারি সংকেতে রুপান্তরিত করতে পারে যা তাকে আবার পালানোর দিক নির্দেশনা প্রদান করে। পালানোর জন্য তাকে একটি ঢাকনা খুলে কম্পমান আধার থেকে বেরিয়ে যেতে হবে যা বাইনারি সংকেত দ্বারা নির্দেশিত। সম্প্রতি বেশ কিছু যন্ত্র রোগীদের নিউরাল বোধের মাধ্যমে তাদেরকে দিয়ে কম্পিউটার স্ক্রিনে একটি কারসরকে নিয়ন্ত্রণ করাতে পারছে, অথবা বানরের মোটর কর্টেক্স থেকে সংকেত নিয়ে তার মাধ্যমে রোবট নিয়ন্ত্রিত বাহু নাড়াতে সক্ষম হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের এই পদ্ধতিটি এ ধরণের যন্ত্রে উপযুক্ত শক্তি সরবরাহ করার জন্য একটি বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারবে এবং স্মৃতির পাঠোদ্ধারের ক্ষেত্রে তা হবে আরও অন্তর্জ্ঞানী। উপরন্তু মস্তিষ্কে অবস্থিত স্মৃতির এ ধরণের রিয়েল-টাইম প্রক্রিয়াজাতকরণের উন্নতির ফলে একদিন হয়ত আমরা স্মৃতিকে সরাসরি কম্পিউটারে ডাউনলোড করতে পারব এবং তা ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারব। [দেখুন: "A Digital Life", by Gordon Bell এবং Jim Gemmell; সাইন্টিফিক আমেরিকান, মার্চ ২০০৭]।

একই সাথে, আমরা অন্য কম্পিউটার প্রকৌশলীদের সাথে মিলে এ পর্যন্ত মস্তিষ্কের স্মৃতি সংরক্ষণ পদ্ধতির সংগঠন সম্পর্কে জানা সকল তথ্যের প্রয়োগের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুন জেনারেশনের বুদ্ধিমান কম্পিউটার এবং নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। কারণ বর্তমানের কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রগুলো কিছু অবধারণ বুঝার ক্ষেত্রে দুঃখজনভাবে ব্যর্থ হয়, যেগুলো মানুষের পক্ষে বোঝা খুব সহজ। যেমন ২০ বছর বয়সের এক যুবক তার হাই স্কুল পর্যায়ের কোন বন্ধুকে দেখলে চিহ্নিত করতে পারাটাই স্বাভাবিক, কিন্তু কম্পিউটারে তার স্মৃতির সংকেতায়ন হয়ে পরবে জটিল। ভবিষ্যতে হয়তোবা অতি সূক্ষ্ণ সেনসরবিশিষ্ট এমন সব কম্পিউটার ও যন্ত্রপাতি তৈরী হবে যে তার মাধ্যমে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলে স্মৃতি সংকেতায়নের যে জটিল শ্রেণিভিত্তিক ও ক্রমান্বয়িক সংগঠন রয়েছে তার সদৃশ একটি যুক্তিভিত্তিক স্থাপত্য নির্মাণ সম্ভব হবে। এ ধরণের স্থাপত্য নির্মাণ করা হলে তা মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলের কার্যক্রমের হুবহু অনুকরণ করতে সক্ষম হবে এবং একসময় জটিল ধরণের অবধারণ নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে তা মানুষের সামর্থকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আমাদের আবিষ্কারগুলো এমন সব দার্শনিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে যা আমার কাছে অতি চাঞ্চল্যকর ও উদ্দীপক বলে মনে হয়েছে। কারণ আমাদের সব স্মৃতি, আবেগ, জ্ঞান ও কল্পনাকে ১ ও ০-এর মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব হলে, এমন কি হতে পারেনা যে, আমরা জেনে যাব আমরা কে এবং ভবিষ্যতে কিভাবে আমাদের জীবনযাত্রা চালিত হবে। তাহলে, আজ থেকে ৫,০০০ বছর পর এমন হওয়া কি সম্ভব নয়, আমরা আমাদের মনকে কম্পিউটারে ডাউনলোড করে তার মাধ্যমে দূরতম বিশ্বে নিরন্তর ভ্রমণ করছি আর সশরীরে না হলেও একটি নেটওয়ার্কের ভিতর বেচে থাকছি চিরকাল?

***** সমাপ্তি *****


প্রধান ধারণাসমূহ

• মস্তিষ্ক কোন জীবের অভিজ্ঞতাসমূহের স্মৃতি তৈরী করতে একটি কনসার্টে ক্রিয়াশীল বিপুল সংখ্যক নিউরনের সাহায্য নেয়।
• একটি ইঁদুরের স্মৃতি গঠনের অঞ্চল হিপোক্যাম্পাসে নিউরোনাল পপুলেশনের সাবসেট বিদ্যমান যার নাম নিউরাল ক্লিক। একেকটি ক্লিক কোন অভিজ্ঞতার একেকটি ঘটনার প্রতি সাড়া দেয়। একটি বিমূর্ত বা সাধারণ বৈশিষ্ট্যের প্রতি সাড়া দিলে অন্যটি আরও নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের প্রতি সাড়া দেয়।
• স্মৃতি সংরক্ষণ করার জন্য যে ক্রমান্বয়িক সংগঠন ব্যবহৃত সেই একই সংগঠন ব্যবহার করে মস্তিষ্ক একগুচ্ছ তাড়িত তাড়নাকে চিন্তা, জ্ঞান বা ব্যবহারে পরিণত করতে পারে। এরকম হওয়ায়, অনুসন্ধানকারীরা সার্বজনীন নিউরাল সংকেত আবিষ্কারের পথে অনেকদূর এগিয়ে গেছেন। এই সার্বজনীন নীতির মাধ্যমেই মস্তিষ্ক দৈহিক অভিজ্ঞতাসমূহকে সংকেতায়িত করে।
• লেখক এবং তার সহকর্মীরা মিলে ক্লিকসমূহের রেকর্ডকৃত কার্যক্রিয়াকে বাইনারি সংকেতে রুপান্তরিত করেছেন। সংকেতের এ ধরণের ডিজিটালকরণ প্রক্রিয়া জন্ম দিতে পারে মনের একটি সংকেতবহি তথা কোডবুকের। এই সংকেতবহিটি হবে চিন্তা এবং অভিজ্ঞতার তালিকা প্রণয়নের চালিকা শক্তি যার মাধ্যমে বিভিন্ন জীবে বা প্রজাতিতে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশের তুলনা করা সম্ভব।

স্মৃতি সংকেতের পাঠোদ্ধারের পথে প্রথম ধাপ

০১. সংরক্ষিত অভিজ্ঞতাঃ- গবেষক দল ইঁদুরগুলোকে তিনটি আকস্মিক ঘটনার অভিজ্ঞতা অর্জন করায়- পিছনের দিকে এক হল্কা বাতাস, একটি আধারের ভিতরে পতন (এলিভেটরে পতনের মত) এবং একটি খাচার ভিতরে ঝাঁকুনি (ভূমিকম্পের সদৃশ)। একই সময়ে একটি রেকর্ডার সিএ১ নিউরনসমূহের এক বৃহৎ দল থেকে ফায়ারিংগুলোর ছক করে ফেলে। প্রতিটি ছক সময়ের সাথে একটি মাত্র কোষের ফায়ারিংকে ধারণ করতে পারে। ফায়ারিংগুলো অভিজ্ঞতার কারণেই ঘটে থাকে।

০২. প্রায়োগিক গড়ন-চিহ্নিতকারী এলগরিদমঃ- একটি ইঁদুর থেকে প্রাপ্ত উপাত্তসমূহকে সফ্‌টওয়্যারের সাহায্যে ত্রিমাত্রিক ছকে অনূদিত করা হল। এই ছকটি প্রাণীর বিশ্রাম অবস্থা এবং আকস্মিক ঘটনার অভিজ্ঞতা অর্জনের অবস্থা উভয় সময়ে তার মস্তিষ্কের রেকর্ডকৃত নিউরনের পূর্ণ সমন্বয়ের কার্যক্রমের প্রতিনিধিত্ব করে। এ ধরণের ছকের মাধ্যমে গবেষকরা কেবল ত্রিমাত্রিক স্থানের মধ্য দিয়ে রেকর্ডকৃত সংকেতগুলোর চলাচল পর্যবেক্ষণ করে প্রাণীর মধ্যে কি ঘটছিল তা পড়তে সক্ষম হয়েছেন। (একটি মুভি ক্লিপের জন্য দেখুন: www.SciAm.com/ontheweb)

০৩. সংকেতায়নকারী ক্লিক আবিষ্কারঃ- আরও বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, একটি ঘটনার সময়কার নিউরাল সমন্বয়ের উপসেট রয়েছে যাকে নিউরাল ক্লিক বলা হয়। একটি ক্লিকের অন্তর্ভুক্ত সকল কোষ একই ধরণের ফায়ারিং গড়ন প্রদর্শন করে এবং কখনই অন্য আরেকটি ক্লিকের অন্তর্ভুক্ত হয়না।

০৪. স্মৃতির সংগঠন আবিষ্কারঃ- অন্যান্য বিশ্লেষণে প্রতিভাত হয়েছে, ভিন্ন ভিন্ন ক্লিক অভিজ্ঞতার ভিন্ন ভিন্ন দিক সংকেতায়িত করে, যা সাধারণ থেকে সুনির্দিষ্ট আকারে বিন্যস্ত হয়। লেখক ধারণা করেছেন, এই ক্রমান্বয়িক সংগঠন একটি পিরামিডের রূপ নিতে পারে যেখানে সবচেয়ে সাধারণ ক্লিক থাকবে পিরামিডের নিচের দিকে এবং উপরের দিকে তা সুনির্দিষ্ট হতে থাকবে। অবশ্য পিরামিডের আকৃতি দ্বারা সেখানে নিউরনের সংখ্যা নির্দেশ করা যায়না, এটি কেবল স্থূল উদাহরণ।

০৫. মস্তিষ্কের কার্যক্রমকে বাইনারি সংকেতে রুপান্তরঃ- প্রাণী যে অভিজ্ঞতা অর্জনের কারণে তার মস্তিষ্কে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্বন্ধে যা জানা গেছে তাকে পরবর্তিতে অনুসন্ধানকারীরা বাইনারি সংকেতের একটি স্ট্রিংয়ে অনূদিত করেছেন যা নিউরাল ক্লিকের কার্যক্রমের প্রতিনিধিত্ব করেছে। এখানে উল্লেখিত বাইনারি স্ট্রিংয়ে ১ মানে একটি নির্দিষ্ট ক্লিক সক্রিয় ছিল, এবং ০ মানে সেটি নিষ্ক্রিয় ছিল। নিউরাল কার্যক্রমের বাইনারি অনুবাদের মাধ্যমে অনেক উপযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে। যেমন, এতে অনুসন্ধানকারীরা এমন জীবের মনের ভাষা বুঝে নিতে পারবেন যারা কথা বলতে পারেনা কিংবা কেবমাত্র চিন্তাশক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক রোবট সৃষ্টি করা যাবে এর মাধ্যমে।

মানুষের মন বুঝার ক্ষমতা

ইঁদুরের মনের তথ্য বের করে আনার ক্ষেত্রে আমাদের পর্যায়ক্রমিক সফলতা একটি নতুন দিগন্তের সূচনা ঘটিয়েছে। একই সাথে মানুষের মস্তিষ্কের অনেকগুলো নিউরনের তথ্যাদি রেকর্ড করা গেলে তার মাধ্যমে মানুষ কি চিন্তা করছে তা বলে দেয়া যেতে পারে।
অবশ্য এক্ষেত্রে ব্যবহারিক পর্যায়ে সফলতা অর্জনের জন্য আরও অনধিক্রামক প্রযুক্তি প্রয়োজন। বর্তমানে যেসব ইইজি এবং ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং যন্ত্রপাতি রয়েছে সেগুলো অনধিক্রামক হলেও যথেষ্ট সংবেদনশীল নয়। তারা মিলিয়ন সংখ্যক স্নায়ু কোষ থেকে অক্সিজেন গ্রহণের হার বা এ ধরণের গড় সংকেত সংগ্রহ করে। এসব যন্ত্র ব্যবহার করাটা হবে একটি ফুটবল মাঠের বাইরে থেকে ভিতরের ভিড়ের শব্দ ও হল্লা শোনার শামিল; তেমন কিছুই বোঝা যাবেনা, কেবল নয়েজ শোনা যাবে যা বিপুল ব্যক্তিগত কথোপকথনের সমন্বয়ে বেড়েই চলবে।
যথেষ্ট সংবেদনশীল যন্ত্র নির্মাণ করা গেলে আমরা বুঝতে পারবো, বোধশক্তিহীন পর্যায়ে থাকা মানুষ আসলেই কিছু চিন্তা করতে পারে কি-না, বা আলঝেইমার্‌স রোগে আক্রান্ত রোগী, যে কথা বলতে পারেনা সে আসলে মানুষের কথোপকথন বুঝতে পারে কি-না। মন পড়ে ফেলার এ ধরণের সক্ষমতা অর্জিত হলে মানসিক বিপর্যয়ের সঠিক রোগ-নিরুপণ সম্ভব হবে এবং এক্ষেত্রে ঔষধ কাজ করছে কি-না তাও বোঝা যাবে। আরও কর্মক্ষম মিথ্যা চিহ্নিতকারী যন্ত্র নির্মাণ সম্ভব হবে।

অবশ্য এরকম সফলতার ঝামেলাও রয়েছে। কারণ এর সাথে সাথে মৌলিক নৈতিক, দার্শনিক ও সামাজিক বিভিন্ন প্রশ্ন জড়িয়ে থাকবে যেগুলোর উত্তর দিতে বিজ্ঞানীরা বাধ্য থাকবেন। আমাদের মধে প্রত্যেকেই হয়ত অপরের মন বুঝতে চাইবেন, কিন্তু কে স্বেচ্ছায় চাইবেন যে তার মন অন্য কেউ বুঝে ফেলুক?

স্মৃতির অণু

১৯৪৯ সালে কানাডীয় মনোবিজ্ঞানী ডোনাল্ড ও হেব এক স্বীকার্যে উল্লেখ করেছিলেন, যখন দুটি স্নায়ু এমনভাবে মিথস্ক্রিয়া করে যে সিন্যাপ্‌সের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের সংকেত স্থানান্তর প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হয় তখনই স্মৃতি উৎপাদিত হয়। সিন্যাপ্‌স হল দুটি নিউরনের সংযোগ বিন্দু। অবশ্য ১৯৮০'র দশকের আগে বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের কোন অংশে হেবের প্রক্রিয়ার চাক্ষুষ প্রমাণ দেখতে পাননি। হিপোক্যাম্পাসের নিউরন জোড়কে ইলেকট্রোডের মাধ্যমে উত্তেজিত করে, সুইডেনের গোটেবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী হোলগার ভিংস্ট্রম ও তার সহকর্মীরা প্রথম দেখতে পান, একটি প্রাক-সিন্যাপটিক নিউরনকে (সংকেত প্রেরক কোষ) পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনের (সংকেত গ্রাহক কোষ) সাথে একই সময়ে কার্যকর করলে সিন্যাপটিক ফলপ্রসূতা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ পোস্টসিন্যাপটিক নিউরন তার অংশীদার প্রাক-সিন্যাপটিক নিউরন কর্তৃক প্রেরিত একই সংখ্যক ইনপুটের প্রতি আগের চেয়ে শক্তিশালীভাবে সাড়া দেয়। গবেষকরা প্রস্তাব করেন, পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনের ঝিল্লীতে অবস্থিত এনএমডিএ গ্রাহক নামক জটিল প্রোটিন এই যুগপৎ সংঘটনকে চিহ্নিত করার কাজে নিয়োজিত থাকে এবং এ কারণেই সিন্যাপটিক ফলপ্রসূতা বৃদ্ধি পায়।

এই প্রকল্পটি প্রমাণ করার জন্য, আমার গবেষণাগার জিনতাত্ত্বিকভাবে এনএমডিএ গ্রাহকের একটি নমুনা কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এক্ষেত্রে এনএমডিএ গ্রাহকটি ভিন্নরূপে এসেছিল। আমরা নিশ্চিত প্রমাণ করেছি, যেসব বয়স্ক ইঁদুরের হিপোক্যাম্পাসে এনএমডিএ গ্রাহকের ঘাটতি রয়েছে তাদের স্মৃতি সংগঠনেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঘাটতি দেখা যায়। অবশ্য এর ঠিক উল্টোটাও আমরা সত্য বলে প্রমাণ পেয়েছি: যখন আমরা হিপোক্যাম্পাস এবং কর্টেক্সে একটি নির্দিষ্ট এনএমডিএ গ্রাহকের সাবইউনিটের (এনআর২বি নামে পরিচিত) উৎপাদন বৃদ্ধি করেছি তখন সৃষ্ট নতুন স্ট্রিংয়ের ইঁদুর (যার নাম ছিল ডুগি) আগের চেয়ে দ্রুত শিখতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি তারা সাধারণ অপরিবর্তিত ইঁদুরের তুলনায় অধিক সময় স্মৃতিসংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।

আমরা বিশ্বাস করি, এনএমডিএ গ্রাহককে কার্যকর এবং অকার্যকর করার মাধ্যমে একসময় স্মৃতি সংকেতায়নকারী নিউরাল ক্লিকের বিভিন্ন গড়নের সমন্বয়কে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে। আর এর ফলে আনবিক পর্যায় থেকে নেটওয়ার্ক পর্যায় পর্যন্ত স্মৃতির আলামতগুলোকে সংযুক্ত করা সম্ভব হবে।

ব্যবহৃত পরিভাষা

Encode – সংকেতায়িত করা
Decode – সংকেতের পাঠোদ্ধার করা
Neuronal polpulation – নিউরোনাল পপুলেশন
Memory – স্মৃতি
Brain – মস্তিষ্ক
Generalized – সাধারণীকৃত
Pattern – নমুনা (গাঠনিক অর্থে গড়ন)
Activity – কার্যক্রিয়া
Response – প্রতিক্রিয়া
Amplitude – বিস্তার
Polyhedron – বহুতলক ঘনবস্তু
Real-time – দ্রুত ফল দেয়ার জন্য নিয়ত পরিবর্তনশীল উপাত্ত গ্রহণ ও তাৎক্ষণিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম এমন।

About মুহাম্মদ

Check Also

[খবর] মস্তিষ্কে কিভাবে স্মৃতি সংরক্ষণ করে রাখি

আমরা মস্তিষ্কে কিভাবে স্মৃতি সংরক্ষণ করে রাখি তা এখনো পুরোপুরি আবিষ্কার হয়নি। মনে করা হয় …

ফেসবুক কমেন্ট


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।