ম্যাক কম্পিউটারে বাংলার রাজত্ব

lead-pic

কিছু কথা:
বাংলা ভাষা নিয়ে হইচই অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে। সেই একাত্তর সাল থেকে আজও সর্বস্থানে বাংলা ভাষার স্থান করে দেয়ার জন্য আমাদের বাঙালীর সে-কি তুমুল প্রচেষ্টা! সেই চেষ্টা স্থান পেয়েছে প্রযুক্তিতে। লিন্যাক্সে একেবারে গোড়ার দিকে বাংলা ভাষার সফল প্রয়োগ করা গেলেও অন্যান্য কোম্পানীর অপারেটিং সিস্টেম, যেমন মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ এক্সপিতে বাংলা ভাষার স্থান করে দিতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে বাঙালী ডেভেলপারদের। একে-তো ছিলো ইউনিকোডের ঝামেলা; তার ওপর বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মত। জনপ্রিয় এই অপারেটিং সিস্টেমদ্বয়ে সফলভাবে বাংলা স্থাপন শেষে আরও একটি জনপ্রিয় অপারেটিং সিস্টেম ইউনিকোড বাংলার ব্যবহার থেকে বাদ পড়ে যায়। আর সেটি হচ্ছে পৃথিবীর সর্বপ্রথম গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেসে স্থানান্তরিত হওয়া অপারেটিং সিস্টেম এপলের ম্যাকিন্টোস। কিন্ত্ত সেই স্বপ্ন্‍ও এখন সফল হয়েছে। আর সেই স্বপ্ন রূপান্তরে এবারও এগিয়ে এসেছে সেই একুশে ডট অর্গ এবং পেছন থেকে কাজ করে গেছেন রাইয়ান কবির নামের এক ভদ্রলোক।

 

ইতিহাস:
ম্যাক অপারেটিং সিস্টেমকে ইউনিকোড সাপোর্টেড করা হয়েছে বেশি দিন হয়নি। কিন্ত্ত সাপোর্টেড করার সাথে সাথে সুযোগ চলে এসেছে ইউনিকোড ব্যবহারকারীদের জন্য বিশাল সুযোগের। কিন্তু একই সাথে ছিলো ম্যাকের বিভিন্ন জটিল স্ক্রিপ্টের ঝামেলা; যার জন্য অনেকেই এতে ইউনিকোড বাংলা ডেভেলপ করতে গিয়ে আবার পিছিয়ে গেছে। বাংলাদেশে ম্যাক কম্পিউটারে বাংলা বলতে সাধারনতঃ বোঝানো হয় আনন্দ কম্পিউটার্সের বিজয় সফটওয়্যারের ব্যবহারকে। প্রেস মিডিয়ার জন্য খুব বড় ধরনের আশীর্বাদ ছিলো এই সফটওয়্যার। অনেক প্রকাশানা ডিজাইনারদের মতে ছাপার অক্ষরের জন্য বিজয়ের ফন্টের বিকল্প হয় না! কিন্তু বড় সমস্যা হচ্ছে বিজয়ের ঐ ফন্টগুলো ইউনিকোড ফন্ট নয়। যে কারনে ঐ ফন্টগুলোতে লেখা বাংলা সার্বজনীন নয়; যদি না বিজয়ের ফন্ট ব্যবহৃত কম্পিউটারে আগে থেকেই ইন্সটল করা থাকে। ফলশ্রুতি এটা নিয়ে বেশ সমস্যা হয় যখন ব্যবহারকারী ওয়েব সাইটে এর প্রয়োগ করতে যায়। একতো ফন্ট ভেঙে যায়, তার উপর অপারেটিং সিস্টেম ও ইন্টারনেট ব্রাউজার ভেদে ফন্ট চিনে নেয়ার সমস্যাটি প্রকোট হয়ে দেখা দেয়। যদিও এখন অনেক ওয়েব ডেভেলপার ব্রাউজারে ফন্ট এম্বেড সিস্টেমটি ব্যবহার করে, কিন্ত্ত তারপরেও এটি সার্বজনীন নয় বলে অনেকেই সন্তুষ্ট নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই প্রযুক্তিটি নির্দিষ্ট ব্রাউজার নির্ভর।
অবশেষে ইউনিকোড ধারনাটি চলে আসার পর বিশ্বে যেন একটি বিপ্লব ঘটে যায়। অনেক বাক বিতন্ডার শেষে কম্পিউটারের বাংলা ভাষা তৈরি হয় ইউনিকোড সিস্টেমে। লিন্যাক্স ও মাইক্রোসফটের ২০০০ সালের পর থেকে প্রকাশিত অপারেটিং সিস্টেমগুলোতে বাংলা ভাষা চমৎকার ভাবে পড়া ও লেখা যায়। শুধু তাই নয়, ইউনিকোড ভিত্তিক যে কোন বাংলা ফন্ট হলেই তা প্রদর্শিত হয়। কিছুদিন আগেও আফসোস ছিলো ম্যাক কম্পিউটারে ইউনিকোডের বাংলা ভাষা নিয়ে; এখন এটিও সফল!

যেভাবে যাত্রা শুরু:
রাইয়ান হচ্ছেন ইউনাইটেড ইন্টারনেশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রিক এবং ইলেক্ট্রনিক ডিপার্টমেন্টের লেকচারার। বাংলাদেশের অন্যতম এপল সার্টিফাইড হার্ডওয়্যার প্রকৌশলী বজলুর রশিদ তাকে উদ্বুদ্ধ করে ম্যাক ওএস এক্স-এ বাংলা ভাষার প্রয়োগের জন্য। রাইয়ান ছিলেন এপল ডেভেলপার মেইলিং লিস্টের একজন সদস্য। সেখানেই তিনি অন্যদের কাছে এ ব্যপারে সাহায্য চান। এক সময় পেয়ে যান এপলেরই একজন, এপল ফন্ট গ্রুপের ম্যানেজার ডেবোরাহ গোল্ডস্মিথকে। যথেষ্ঠ সাহায্য করেন ভদ্রমহিলা। তিনিই পরিচয় করিয়ে দেন এপলের আরেকজন ডেভেলপার লি কলিনসের সাথে। কলিনসের পদবী হচ্ছে ম্যাকের ম্যানেজার, অপারেটিং সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং, এশিয়া। জানান, ট্রু টাইপ ম্যাক ফন্ট ডেভেলপ করার জন্য এপল ফন্ট টুল ব্যবহার করতে এবং এডোপ্ট এর জন্য এপল এ্যডভান্স টাইপোগ্রাফি ব্যবহার করতে। এটিই একমাত্র পদ্ধতি ম্যাক ওএস এক্স-এ বাংলা ইউনিকোড ব্যবহার করার।

ফন্ট বাছাই ও একুশে ডট অর্গ:
প্রথম প্রথম ‘লিখন’ নামক ইউনিকোড ফন্টটি দিয়ে কাজ করা শুরু হলেও, মন ভরতো না রাইয়ানের। কেননা, খুব একটা ভালো কোয়ালিটির ছিলো না অপেন সোর্সের এই ফন্টটি। পরে একুশে ডট অর্গে এসে তিনি পেয়ে যান বিশাল ফন্টের ভান্ডার। এখান থেকে তিনি ‘রূপালী’ নামের ফন্টটি দিয়ে কাজ শুরু করে। এতে গ্লাফইস এবং এএটি এর প্রযুক্তি ব্যবহার করে ম্যাকের জন্য যোগ্য করার চেষ্টা চালান। পরে একুশের অমি আজাদের মাধ্যমে অলট্রাস্টের রবিন আপটনের সাথে যোগাযোগ করলে প্রথমেই তিনি তাকে আমন্ত্রন জানান একটি কমন প্লাটফর্ম তৈরি করার জন্য একুশে ডট অর্গে যুক্ত হতে। এখানে থেকেই তিনি জানতে পারেন একুশের মূল প্রচেষ্টা হচ্ছে লিন্যাক্সের জন্য বাংলা ভাষার ডেভেলপ করা। একুশের সাহায্য নিয়ে তিনি ম্যাকের এই প্রোজেক্টকে আরও শক্তিশালী করে তোলেন। অন্যদিকে এপলও যথেষ্ঠ আগ্রহী বাংলা ইউনিকোড সাপোর্টে। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেছে এপলের বর্তমানের অপারেটিং সিস্টেমে ইউনিকোড সাপোর্ট স্বয়ংসম্পূর্ন নয় । কিছুটা হলেও সমস্যা রয়ে গেছে। তাই তিনি এখনও ম্যাকের বিভিন্ন মেজর রিলিজগুলোর উপর পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানান, এপ্রিলে ২০০৭ এর দিকে ম্যাক যে অপারেটিং সিস্টেমটি (ম্যাক ওএস এক্স ১০.৫) ছাড়ছে সেটি হবে সমস্যাবিহীন। এরই মধ্যে জানা গেছে, এপল তাদের অপারেটিং সিস্টেমকে বাংলা ভাষায় লোকালাইজেশনে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সেটি কবে হবে এটা এখনও জানা যায় নি।

ম্যাকের জন্য বাংলা ইউনিকোড:
ম্যাকের জন্য এখন পর্যন্ত রূপালী ও সোলাইমান লিপি নামক ফন্টদুটি ডেভেলোপ করা হয়েছে। এপলে অপারেটিং সিস্টেম ও সফটওয়্যারগুলোতে ফন্টদ্বয় চমৎকার কাজ করে। টাইপ করার জন্য আপাতত আলাদা করে কোন কিবোর্ড লেআউট ছাড়া হয় নি। তবে ম্যাকের নিজস্ব এ্যপ্লিকেশন ব্যবহার করে কিবোর্ড ম্যাপিং করে নেয়া যাবে বলে জানান রাইয়ান। অবশ্য ভবিষ্যতে তিনি একটি কিবোর্ড লেআউট ছাড়ার কথা চিন্তা ভাবনা করছেন। এটি হবে সম্পূর্ন ফোনেটিক লেআউটে।

যে সব সমস্যা রয়ে গেছে:
ম্যাক কম্পিউটারে ইউনিকোড বাংলা ভাষার প্রয়োগ এটিই প্রথম বলে এর সমস্যাগুলো ধরা একটু ঝামেলাকর হয়ে গেছে বলতে হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশসহ বিশে¦ বাঙালীদের কাছে ম্যাক কম্পিউটারের চেয়ে পিসি অনেক বেশি জনপ্রিয়; যে কারনে এর ব্যবহারও হচ্ছে তুলনামূলকভাবে কম। রাইয়ানের তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত তার তৈরি করা এপলের জন্য বাংলা ফন্ট ৬২জন নামিয়েছেন। এদের মধ্যেই অনেকে এর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিভিন্ন মত দিয়েছেন।
তবে এখন পর্যন্ত যে সমস্যাটি প্রকট হয়ে দেখা গেছে তা হলো একার-আকার (ে া) নিয়ে সমস্যা। উইন্ডোজে একার-আকার এর ক্ষেত্রে একটি মাত্র কমান্ড দিয়ে এক সাথে একার-আকার ব্যবহার করা যায়। কিন্ত্ত ম্যাকের স্ক্রিপ্টে বিভিন্ন জটিলতার কারনে এটি ব্যবহার করতে হয় ম্যানুয়ালি। অর্থাৎ, একার এবং আকারের জন্য আলাদা করে কমান্ড দিতে হয়। এছাড়াও রেন্ডারিং ইঞ্জিনের কারনে উইন্ডোজে তৈরি করা ইউনিকোডের ওয়েব সাইটগুলো প্রদর্শিত হতে ঝামেলা করে। দুই একটা সাইটের ক্ষেত্রে ম্যাকের জনপ্রিয় ওয়েব ব্রাউজার সাফারির ক্র্যাশ এর মতো ঘটনাও ঘটেছে। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে এডোবি পরিবারের সফটওয়্যারগুলোকে নিয়ে। এডোবি ভাষার জন্য সাধারণতঃ অপারেটিং সিস্টেমের স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে না। এরা ভাষার জন্য নিজস্ব স্ক্রিপ্ট আলাদা করে তৈরি করে নিয়েছে। আর দুঃখের কথা হচ্ছে, এর মধ্যে বাংলা ভাষার জটিল স্ক্রিপ্টের সাপোর্ট নেই। যার ফলে শুধু ম্যাক অপারেটিং সিস্টেম কেন, উইন্ডোজেও এই পরিবারের সফটওয়্যারগুলোতে ইউনিকোড বাংলা ভাষা ব্যবহার করা যায় না। উল্লেখ্য ফটোশপ, ইলাস্ট্রেটর, ইনডিজাইন, ফ্ল্যাশ এর মতো অত্যন্ত জনপ্রিয় সফটওয়্যারগুলোই এডোবি পরিবারের সফটওয়্যার।


শেষ কথা:
বাঙালীদের ক্ষেত্রে যে বিষয়টা লক্ষ্য করা গেছে তা হলো, কোন এক বিষয়ে সাফল্য আসলে সেটি নিয়ে গবেষনা করা ছেড়ে দেয়া হয়! এটার বড় উদাহরন হচ্ছে ইউনিকোডের বাংলা ফন্ট। প্রথম দিকে মাইক্রোসফট বৃন্দা নামের যে ফন্টটি তাদের অপারেটিং সিস্টেম এক্সপি সার্ভিস প্যাক-২ এর সাথে যুক্ত করে দেয় সেটি শুধু বাংলাদেশেই নয় কোলকাতায়ও ভালো সমালোচিত হয়েছে। কিন্তু তাই বলে এর বিকল্প হিসেবে নিখুঁত হিন্ট করা ওপেন সোর্স ফন্ট এখন পর্যন্ত কেউ ডেভেলপ করেনি। অনেক অপেন সোর্সের ফন্ট আছে , যা দেখতে বৃন্দার চেয়ে হাজারগুনে সুন্দর; কিন্ত্ত পয়েন্ট ছোট বড় করলে এর ফাঁকটা ধরা পড়ে। অর্থাৎ প্রতিটি পয়েন্ট অনুযায়ী একে ঠিক মতো হিন্ট করা হয়নি। ইউনিকোডে মানুষকে আগ্রহী করার জন্য সৌন্দর্যও একটি বড় বিষয়, এটাও ডেভেলপারদের মনে রাখা উচিৎ।

ফেসবুক কমেন্ট


One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use

আপনি চাইলে এই এইচটিএমএল ট্যাগগুলোও ব্যবহার করতে পারেন: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

*