শিমুর শক্তির বাক্স

(প্রথম আলো  ২৬-০৬-২০১০)

উদ্ভাবনী গুণ তাঁর সহজাত। বিদ্যায় তিনি বেশি দূর এগোতে না
পারলেও কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতার কমতি নেই। এসব মিলিয়ে এমন এক যন্ত্র
উদ্ভাবন করেছেন, যা সেচযন্ত্রের মোটরের সঙ্গে জুড়ে দিলে প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে
যায় শক্তি। অল্প সময়ে অনেক বেশি সেচ দেওয়া যায় জমিতে। এতে বিদ্যুৎ-চালিত
মোটরের ক্ষেত্রে যেমন লোডশেডিংয়ে বিড়ম্বনা থেকে অনেকটাই রক্ষা পাওয়া যায়,
তেমনি জ্বলানিচালিত মোটরের ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ গুণ জ্বালানি সাশ্রয় হয়। ধান
ভানার কলে মোটরের সঙ্গে এই যন্ত্র জুড়ে দিলে অল্প সময়েই অনেক ধান ভানা যায়।

এই
করিতকর্মা যন্ত্রের উদ্ভাবক শিমসন সাহা (৫৬)। শিমু নামেই সবাই তাঁকে চেনে।
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার নারকেলবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা তিনি। নিজের
উদ্ভাবিত যন্ত্রের নাম দিয়েছেন ‘মেকানিক্যাল পাওয়ার বক্স’। সহজ ভাষায় বললে
‘শক্তির বাক্স’। শিমুর এই শক্তির বাক্সের গুণে এর মধ্যে এলাকাবাসী উপকার
পেয়েছে। যন্ত্রটি বানাতে মোট খরচ ১৬ হাজার টাকার মতো।২০০৮ সালে জেলা
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ কৃষিতে প্রশংসনীয় অবদানের জন্য পুরস্কার দেয়। এতে
উদ্ভাবিত যন্ত্রের জন্য প্রথম পুরস্কার পান শিমু।


যেভাবে শুরু: দশম
শ্রেণীর পর আর পড়াশোনা হয়নি শিমুর। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে চট্টগ্রাম শহরে
গিয়ে বড় ভাইয়ের ওয়ার্কশপে যোগ দেন তিনি। মোগলটুলী এলাকায় তা ছিল ছোটখাটো
একটি কারখানা, যেখানে বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি হতো। এই ওয়ার্কশপে কাজ
করতে করতে কলকব্জা সম্পর্কে ধারণা জন্মে তাঁর।

 

দীর্ঘ দিন ওই কারখানায়
ছিলেন শিমু। ১৯৮৯ সালে তিনি নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি ও
বিদ্যুৎ-চালিত সেচযন্ত্র মেরামত করে আয় করতে থাকেন। কম দামে অকেজো
সেচযন্ত্র কিনে এনে তা মেরামত করে বিক্রি করাও তাঁর জীবিকার অংশ হয়ে
দাঁড়ায়। নিজের সেচযন্ত্র দিয়ে বোরো ধানের জমিতে সেচ দিয়েও সংসার চালাতে
থাকেন। ১৯৯১ সালে বিয়ে করেন তিনি। বর্তমানে স্ত্রী আলো সাহা, এক মেয়ে ও এক
ছেলে নিয়ে তাঁর সংসার।

 

শিমু জানান, ২০০০ সালে ডিজেলের দাম হঠাৎ বেড়ে
যায়। বাজারে দেখা দেয় সংকট। এতে বোরোর জমিতে সেচ দেওয়া নিয়ে বিপাকে পড়েন
তিনি। এ সময় জ্বালানিবিহীন সেচযন্ত্র উদ্ভাবনের চিন্তা তাঁর মাথায় আসে।
বাড়িতে বসে একাকী যন্ত্রপাতি নিয়ে শুরু হয় তাঁর খুটখাট। দীর্ঘ সাত বছর ধরে
চেষ্টার পর সাফল্য এসে ধরা দেয়। কাঙ্ক্ষিত প্যাডেল-চালিত সেচযন্ত্র
আবিষ্কার করেন তিনি। এর জন্য কম মূল্য দিতে হয়নি তাঁকে। খরচ জোগাতে বাড়ির
বড় বড় একাধিক গাছ কেটে বিক্রি করেছেন তিনি। ইজারা দিয়েছেন মাছের পুকুর।

 

বুদ্ধি
খুলল হুট করে: ২০০৭ সালে শিমুর মাথায় হঠাৎ করেই বুদ্ধি খেলে যায়,
প্যাডেল-চালিত সেচযন্ত্রের একটি অংশ আলাদা করে প্রচলিত সেচযন্ত্রের মোটরের
সঙ্গে জুড়ে দিলে এর শক্তি দ্বিগুণ হতে পারে। কিন্তু এই শক্তির বাক্সটিকে
আরও উন্নত করা প্রয়োজন। শুরু হয় তাঁর সে চেষ্টা। রাত-দিন যন্ত্রপাতি নিয়ে
পড়ে থাকেন তিনি। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০০৮ সালে তিনি সফল হন।


১০
ইঞ্চি দীর্ঘ, ছয় ইঞ্চি চওড়া ও ১১ ইঞ্চি উচ্চতার একটি লোহার বাক্স। এর মধ্যে
দুটি পেনিয়াম আছে। পেনিয়াম দুটিকে যুক্ত করেছে দুটি দণ্ড। পেনিয়ামগুলোর
দাঁতগুলো পরস্পর আবদ্ধ। একটি ঘুরলে অন্যটিও ঘোরে। বাক্সের বাইরে দুই পাশে
দণ্ড। দণ্ডের সঙ্গে বাক্সের সমান আকারের দুটি চাকতি। প্রতিটি চাকতির সঙ্গে
রয়েছে তিনটি করে লোহার খণ্ড। দুটি খণ্ডের ওজন একই। অন্যটির ওজন সামান্য
বেশি। এই হচ্ছে মেকানিক্যাল পাওয়ার বক্স। মূল ইঞ্জিনের সঙ্গে একটি বেল্টের
মাধ্যমে এটি যুক্ত করা হয়। যন্ত্র যত শক্তি উৎপন্ন করবে, পাওয়ার বক্সের
মাধ্যমে তা দ্বিগুণ হয়ে যাবে।


যন্ত্রটির জাদুকরি কাজ: শিমু জানান,
যন্ত্রটিকে তিন অশ্বশক্তির একটি মোটরের সঙ্গে জুড়ে এর ক্ষমতা দ্বিগুণেরও
বেশি করতে পেরেছেন। এতে মোটরটি দিয়ে তিনি অল্প সময়ে অনেক বেশি পানি তুলতে
সক্ষম হন। সময় অনুপাতে পানি তোলার পরিমাণ দিয়ে মোটরের এই শক্তি বৃদ্ধির
পরিমাপ করেন তিনি।


এ বছরই যন্ত্রটি সাড়ে আট অশ্বশক্তির মোটরে জুড়ে ধান
ভানতে সক্ষম হন শিমু। শিমুর ভাষ্য, সাড়ে আট অশ্বশক্তির মোটর ধান ভানতে পারে
না। পাওয়ার বক্স জুড়ে দেওয়ায় একই মোটর ধান ভানার শক্তি অর্জন করে। এতে
জ্বালানিচালিত মোটরে জ্বালানি-ব্যয়ও প্রায় অর্ধেক কমে যায়। এখন বাড়িতে ধান
ভানার যন্ত্রের মোটরে শক্তির বাক্স ব্যবহার করে ভালো আয় হচ্ছে তাঁর।


এক
সকালে শিমুর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে ধান ভানার যন্ত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা
যায়। গ্রামের কয়েকজন কৃষক ধান নিয়ে এসেছেন চাল করতে। শিমু ধান ভানার
যন্ত্রের সঙ্গে লাগানো সাড়ে আট অশ্বশক্তির মোটরের সঙ্গে পাওয়ার বক্স জুড়ে
দেন। শুরু হয় ধান ভানা।
শিমু বলেন, ১৬ অশ্বশক্তির মোটর ব্যবহার করলে এক
লিটার জ্বালানিতে এক ঘণ্টায় সাড়ে চার মণ ধান ভানা যায়। পাওয়ার বক্স জুড়ে
দিলে সাড়ে আট অশ্বশক্তির মোটর যে শক্তি অর্জন করে, এতে এক লিটার জ্বালানিতে
এক ঘণ্টায় সাত মণ ধান ভানা যায়।
ধান ভানতে আসা কৃষক শেখর রায় (৩০),
পরিতোষ রায় (৩৫), আবুল খন্দকার (৪৫) বলেন, শিমুর কলে অল্প সময়ে বেশি ধান
ভানা যায়। এতে খরচও কম পড়ে।


তাঁরা যা বলেন: নারকেলবাড়ী গ্রামের
সেচ-ব্যবসায়ী জেমস বাড়ৈ (৪৫) জানান, এর আগে তিনি তিন অশ্বশক্তির মোটর দিয়ে
বোরো খেতে সেচ দিতেন। শিমুর পরামর্শে তাঁর পাওয়ার বক্স ব্যবহার করে একই
সময়ে জমিতে চার গুণ বেশি পানি দিতে পারছেন।


কোটালীপাড়া উপজেলার সাবেক
কৃষি কর্মকর্তা (বর্তমানে গোপালগঞ্জ সদরে দায়িত্বরত) মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন,
‘পাওয়ার বক্স পরীক্ষামূলকভাবে সেচযন্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেখা গেছে,
সাধারণ সেচযন্ত্রের চেয়ে একই খরচে একই সময়ে দ্বিগুণেরও বেশি সেচ দেওয়া
যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে কয়েকজন তাঁর এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। আমি দেখেছি,
তাঁরা সুফল পাচ্ছেন।’

 

জেলা কৃষি কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার সাহা বলেন,
‘শিমুর পাওয়ার বক্স সেচযন্ত্রে লাগালে এর ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়। আরও গবেষণার
মাধ্যমে যন্ত্রটি উন্নত করে কৃষকদের হাতে পৌঁছে দিলে কৃষিতে গতিসঞ্চার হবে
বলে মনে করি।’


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কবির মাহমুদ বলেন,
শিমুর উদ্ভাবিত মেকানিক্যাল পাওয়ার বক্সটি তিনি দেখেছেন। এটি নতুন উদ্ভাবিত
যন্ত্র বলে তিনি মনে করেন। এই প্রযুক্তি এলাকায় স্বল্প পরিসরে ব্যবহূত
হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের উচিত, যন্ত্রটি পরীক্ষা করে শিমুর উদ্ভাবনকে
স্বীকৃতি দেওয়া।

ফেসবুক কমেন্ট


8 Comments

  1. আমার মনে হয় এই দেশ এই আবিস্কার এর দাম দেয়না। তা যদি না হত এখন যেমন শিমুর শক্তির বাক্সর নাম শোনা যায় তেমনি কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয় চট্রগ্রামের এক জন আবিস্কার করেছিলেন জেনারেটর বা ব্যাটারী ছাড়া অফূরন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের ট্রান্স-ফর্মার । চট্রগ্রামের রাউজান উপজেলার জয়ণাল আবেদিন তৈরী করে ছিলেন পানি কে জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করে মোটর জান চালানো। পরে জয়ণাল আবেদিনকে এর জন্য প্রান দিতে হয়।
    এগুলো আসলে আমাদের জাতীয় পর্যায়ে কোন কাজে আসে না বিভিন্ন মহলের অনৈতিকতার কারনে।

  2. এই দেশ যদি এই সকল প্রতিভার মূল্য দিত তাহলে আরো অনেক নতুন নতুন প্রতিভা ও নতুন নতুন অবিষ্কারের খোজ মিলত।
    কিন্তু ………..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use

আপনি চাইলে এই এইচটিএমএল ট্যাগগুলোও ব্যবহার করতে পারেন: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

*