আগামী দিনের নবায়নযোগ্য জ্বালানী শক্তির উৎসঃ ফুয়েল সেল

ফুয়েল সেল হল এক ধরনের রাসায়নিক ক্রিয়ার দ্বারা বিদ্যু-প্রবাহ সৃষ্টিকারী যন্ত্র । জার্মান বিজ্ঞানি খ্রীষ্টান ফ্রেড্রিক স্কোবিয়েন (Christian Friedrich Schönbein) প্রথম ফুয়েল সেল এর সন্মধে ধারনা দেন ১৮৩৮ সালে ।
আর তার টিক পরের বছর ১৮৩৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে সৌখিন ব্রিটিশ পদার্থবিদ স্যার উইলিয়াম রর্বাট গ্রোভ ফুয়েল সেল এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারনা বাস্তবায়ন করেন।   ‍‍১৯৫৮ সালে প্রথম বারের মত বানিজ্যকভাবে ফুয়েল সেল এর ব্যবহার আরাম্ভ হয়। ফুয়েল সেল সাধারন ব্যটারি (তড়িৎ রাসায়নিক কোষ) এর চাইতে ভিন্ন ধরনের। সাধারন ব্যটারি এর রাসায়নিক উপাদান শেষ হবার সাথে সাথে আর ব্যবহার উপযোগী থাকে না কিন্তু ফুয়েল সেল এর রাসায়নিক উপাদান প্রতিবার প্রদান করে তা ব্যবহার করা যায়। তাই এটা এক ধরনের নবায়ানযোগ্য জ্বালানীর মাধ্যম। ফুয়েল সেল এর প্রধান রাসায়নিক উপাদান হল হাইড্রোজেন  এবং বাতাস থেকে প্রাপ্ত আক্সিজেন। তাছাড়া আন্যান্য রাসায়নিক উপাদানের মধ্যে হাইড্রকার্বন যৌগ যেমন এলকোহল ব্যাবহার করা হয়।  বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ফুয়েল সেল পাওয়া যায় এবং এটা নির্ভর করে রাসায়নিক উপাদানের উপর।   ফুয়েল সেল এর রাসায়নিক উপাদান ভিন্নতার জন্য বিভিন্ন প্রকারের নামকরন করা হয়। আর তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো যেমনঃ ১) প্রোটোন বিনিময়কারী ফুয়েল সেল, ২) প্রত্যক্ষ ব্যবহৃত মিথানল ফুয়েল সেল অথবা মিথানল ফুয়েল সেল, ৩) সলিড অক্সাইড ফুয়েল সেল, ৪) বিগলিত কার্বনেট ফুয়েল সেল, ৫) এলকালাইন বা ক্ষারধর্মী ফুয়েল সেল ইত্যাদি। বিভিন্ন ধরনের ফুয়েল সেল পাওয়া গেলেও তাদের কর্ম পদ্ধতি এক। ফুয়েল সেল এ হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় সরাসরি ডিসি কারেন্ট হয় এবং একই সাথে পানি ও তাপ উৎপন্ন হয় (চিত্র ১)। সাধারন ব্যাটারি মতো ফুয়েল সেলেও এন্যোড (ধনাত্নক প্রান্ত) এবং ক্যাথোড (ঋনাত্নক প্রান্ত) এর মাঝে ইলেকট্রোলাইট থাকে। তাই এর গঠন অনেকটা স্যান্ডউইচের মতো। ন্যোডে হাইড্রোজেন ভেঙ্গে তৈরি হয় প্রোটন (H+) এবং ইলেকট্রন (e)প্রোটনটি ইলেক্ট্রোলাইটের মধ্য দিয়ে ক্যাথোডে গিয়ে অক্সিজেনের সাথে মিশে তৈরি করে পানিআর এই ইলেকট্রনের চলাফেরায় তৈরি হয় বিদ্যু

ফুয়েল সেল ওজোনে হাল্কা এবং পরিবেশ বান্ধব। কিন্তূ অত্যন্ত ব্যয়বহূল হওয়ায় এর জনপ্রিয়তা এতোটা লক্ষ্য করা যায় না। বর্তমানে জ্বালানী সমস্যার সমাধানের জন্য বিজ্ঞানী ও গবেষকরা ফুয়েল সেলের প্রযুক্তিগত উন্নতির চেষ্টা করছেন।  ইতিমধ্যে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গাড়ী প্রস্তুতকারী ফোর্ড, ভলভো, টয়োটা ইত্যাদি কোম্পানী ফুয়েল সেল এর পরিচালিত গাড়ীর নমুনা বা মডেল তৈরী করেছে। ফুয়েল সেল চালিত গাড়ীগুলোকে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল কার বলা হয়তবে হাইড্রোজেনের উৎপাদন, মজুদ এবং সরবরাহ করা বেশ কঠিনবহুদিন আগে আবিষ্কৃত হলেও ফুয়েল সেল জনপ্রিয় না হবার পেছনে এটাও একটি বড় কারণবর্তমানে সাধারণত প্রাকৃতিক গ্যাস, প্রোপেন, মিথানল ইত্যাদি থেকে রিফর্মিংয়ের মাধ্যমে হাইড্রোকার্বন কে হাইড্রোজেন গ্যাসে রূপান্তরিত করা হয়তবে এ ব্যাপারে এখনো গবেষনা চলছেএছাড়াও বর্তমানে অল্প পরিমান জায়গায়, রিফর্মিংয়ের মাধ্যমে রূপান্তরিত হাইড্রোজেন গ্যাসের মজুদ অধিক পরিমানে বৃদ্ধি করার জন্যে মেটাল অরগানিক ফ্রেম (ধাতু ও হাইড্রোকার্বন সম্মিলিত যৌগ) নামক নতুন যৌগ নিয়ে ব্যাপক গবেষনা চলছেঅটোমোবাইল ছাড়াও বিভিন্ন বহনযোগ্য ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি যেমনঃ ল্যাপটপ, ক্যামেরা, মোবাইল ফোন ইত্যাদিতে ফুয়েল সেল ব্যবহার করা হয় এছাড়াও অনেক গবেষক ফুয়েল সেল চালিত বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র তৈরির কথা ভাবছেনপ্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাগুলো (যেমন বিদ্যু উৎপাদন খরচ, অধিক পরিমানে হাইড্রোজেন গ্যাসের মজুদ বৃদ্ধির নিশ্চয়তা ইত্যাদি) কাটিয়ে উঠতে পারলে নির্ভরযোগ্য এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানী হিসাবে ফুয়েল সেলই হয়ে উঠবে আগামী দিনের শক্তির প্রধান উৎসfuel_cell

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

চিত্র ১ঃ সাধারন ফুয়েল সেলর গঠন প্রনালী।

Sujan Chowdhuryসুজন চৌধুরী (গবেষক ফুয়েল সেল ও নানোপ্রযুক্তি)

 

 

ফেসবুক কমেন্ট


3 Comments

  1. সুজন চৌধুরি লিখিত ফুয়েল সেল পড়ে খুব ভালো লাগল৤ খুবই সহজ একটি ‎চিত্র দিয়ে বিষয়টি বুঝিয়েছেন৤ ধন্যবাদ তাঁকে৤ তবে বালবের দুই দিকেই e- ‎হিসেবে দেখানো হয়ে গেছে, এটি এয্‍‌নোডের দিকে ‎e- হবে না, তাহলে বিদ্যুৎ ‎প্রবাহ হবে না৤ আর যেহেতু এটি গবেষণা-কাজ তাই তির চিহ্ন উলটো দিকে ‎হলে মনে হয় ঠিক হত৤ কারণ ইলেকট্রন(-) ফ্লো হয় প্রোটন বা পজিটিভের ‎‎( ) দিকে৤ এটা আমার ধারণা৤ আপনিও লিখেছেন, “প্রোটনটি ‎ইলেক্ট্রোলাইটের মধ্য দিয়ে ক্যাথোডে গিয়ে অক্সিজেনের সাথে মিশে…”৤ ‎সাধারণভাবে ( ) থেকে (-) এর দিকে বিদ্যুৎ চলে বলে যে কথা চালু আছে ‎সেটি এখানে দেখানো ঠিক নয়, যেহেতু এটি গবেষণা কাজ৤ তবে রচনাটি খুবই ‎ভালো, আরও লিখুন৤ এটি নিন্দা ভেবে মোটেই বিষণ্ণ হবেন না, এটি ‎আলোচনা৤ বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে মতামত দিয়ে আলোকপাত কুরন৤ ‎
    মনোজকুমার দ. গিরিশ ‎
    কোলকাতা ‎

  2. ধন্যবাদ আপনার সুচিন্তিত মতামতের জন্য। আমার আসলে প্রোটন চলাচলের চিহ্নটা প্রদান করা উচিৎ ছিল। তাছাড়া আমার মনে হয় চিত্রটি বর্ননা এর জন্য সঠিক আছে। আমার বাংলাতে লিখার অভ্যাস তেমন নাই তারপরেও পরবর্তী লিখা আশা করি খুব শিঘ্রি ওয়েব এ জমা দিব।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use

আপনি চাইলে এই এইচটিএমএল ট্যাগগুলোও ব্যবহার করতে পারেন: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

*