কোয়ান্টাম সংখ্যাতত্ত্বের জনক

s_n_bose.gif'যারা বলেন যে, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা সম্ভব নয়, তারা হয় বাংলা জানেন
না, নয়তো বিজ্ঞান জানেন না।' আগামী প্রজন্মের উদ্দেশে এই চিরস্মরণীয়
উক্তিটি যিনি করেছিলেন, তিনি হলেন উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠতর প্রতিভাদের একজন_
'সত্যেন্দ্রনাথ বসু'। যে সময়টাতে জন্মেছিলেন বিজ্ঞানের চার কিংবদন্তি_
পরমাণু বিজ্ঞানী লিস মিটনার, অটোহ্যান, আলবার্ট আইনস্টাইন ও ম্যাক্সভন
লু-এর মতো প্রতিভাবান বিজ্ঞানীরা; সময়ের সেই সুবর্ণ ধারায় এ উপমহাদেশে
রামানুজন, মেঘনাদ সাহা, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু এবং রবীন্দ্রনাথের
পাশাপাশি জন্মগ্রহণ করেন আরেক যোগ্য উত্তরসূরি সত্যেন্দ্রনাথ বসু।
সত্যেন্দ্রনাথের বিশেষত্ব এখানেই, তিনি তার জীবনের সেরা কাজটি করেছিলেন এই
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের একটি কক্ষে বসে। এর মাধ্যমে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বপ্রেক্ষাপটে পরিচিত নাম হয়ে ওঠে। পদার্থবিজ্ঞানে
ইতিহাসে বোসের নাম বোসন কণা হিসেবে চিরস্থায়ী আসন নেয়।

কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই বসুর নাম মনে রাখেনি। তার বাস করা বাড়িটি
ভেঙে ফেলেছে। তাঁর নথিপত্রও সংরক্ষণ করতে পারেনি। আসলে আমাদের দেশের মাটি
কৃতজ্ঞতাবোধ জিনিসটা বোঝে না। ইতিহাস জিনিসটা তাদের কাছে অর্থহীন। দ্রুত
মন থেকে মুছে ফেলাটাই স্বাভাবিক ব্যাপার।
এটা এমন এক সময়ের কথা বলা হচ্ছে, যখন পৃথিবী এক বিশাল জ্ঞান-বিজ্ঞানের
পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ধাবিত হচ্ছিল। পুরনো ধারণা বদলে দিয়ে নতুন নতুন
ধারণা ঝড়ের মতো এসে পড়ছে। ঠিক এ রকম একটি সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ
অধ্যাপক 'প্লাঙ্ক সূত্র ও আলোকতত্ত্বের কোয়ান্টাম প্রকল্প' নামে চার
পৃষ্ঠার এক মৌলিক প্রবন্ধ লিখে পাঠালেন ইংল্যান্ডের ফিলোসফিক্যাল
ম্যাগাজিন নামক এক বিজ্ঞান গবেষণা পত্রিকায়। কিন্তু সেখানে প্রকাশের
অযোগ্য বিবেচিত হওয়ায় বোস একটি চিঠিসহ তা পাঠালেন আপেক্ষিক তত্ত্বের জনক
আলবার্ট আইনস্টাইনের কাছে। আইনস্টাইন এ প্রবন্ধের গুরুত্ব সঙ্গে সঙ্গে
অনুধাবন করেন এবং সাইট শ্রিফট ফ্যুর ফিজিক পত্রিকায় ১৯২৪ সালে তা প্রকাশের
ব্যবস্থা করেন। মন্তব্যটি ছিল :আমার মতে, প্লাঙ্কের সূত্রের ক্ষেত্রে বসু
কর্তৃক নির্ধারণ পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এবং এই তত্ত্ব আদর্শ
গ্যাসের কোয়ান্টামতত্ত্বে প্রয়োগ করা সম্ভব, যা আমি অন্যত্র দেখাব। এর
পরপরই এই প্রবন্ধ বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যানতত্ত্ব হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে
এবং কোয়ান্টাম সংখ্যাতত্ত্বের জনক হিসেবে বোসের নাম ইতিহাসে চিরস্মরণীয়
হয়ে থাকবে। এ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে তিনি আরও অনেক গবেষণাপত্র
লিখেছেন।
১৮৯৪ সালের ১ জানুয়ারি উত্তর কলকাতার গোয়াবাগান অঞ্চলে ঈশ্বরমিল লেনের
পৈতৃক গৃহে তাঁর জন্ম। মৃত্যু ১৯৭৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। বাবা রেলওয়ের
হিসাবরক্ষক সুরেন্দ্রনাথ বসু, মা আমোদিনী দেবী। আর মাতামহ মতিলাল রায়
চৌধুরী ছিলেন একজন আইনজীবী। ১৯০৯ সালে তিনি হিন্দু স্কুল থেকে প্রবেশিকা
(এন্ট্রান্স) পরীক্ষায় ৫ম স্থান ও ১৯১১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে
আইএসসি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। অতঃপর ১৯১৩ সালে গণিতে অনার্সে
শীর্ষস্থান এবং ১৯১৫ সালে মিশ্রগণিতে বিজ্ঞান স্নম্নাতকোত্তর পরীক্ষায় ১ম
শ্রেণীতে ১ম স্থান অধিকার করেন। ১৯১৪ সালে তিনি বিয়ে করেন ডা.
যোগেন্দ্রনাথ ঘোষের কন্যা উষাবতী দেবীকে। ছাত্রজীবনে তার সহপাঠীদের মধ্যে
যারা খ্যাতিমান ছিলেন তাদের মধ্যে মেঘনাদ সাহা, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ,
জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, রঞ্জন সেন ও শৈলেন ঘোষ উল্লেখযোগ্য। তাঁদের
অগ্রগামী শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন প্রশান্ত মহলানবিশ, আচার্য
প্রফুল্লচন্দ্র, অধ্যাপক ডি.এন. মলি্লক, অধ্যাপক শ্যামদাস মুখোপাধ্যায়
প্রমুখ ব্যক্তিত্ব।
১৯১৮-৫৫ সাল পর্যন্ত সময়কালে তার মাত্র ২৯টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত
হয়। অনেকের কাছ থেকে জানা যায়, তিনি সামান্য ত্রুটিযুক্ত কাজও প্রকাশ করতে
চাইতেন না। ফলে তার বেশকিছু গবেষণা প্রবন্ধ বা বক্তৃতামালা হারিয়ে গেছে।
তিনি বিখ্যাত গণিতজ্ঞ লাঞ্জেভাঁর গল্প প্রায়শ করতেন। এই গণিতজ্ঞ নাৎসী
কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন। বন্দি থাকা অবস্থায় বর্বর নাৎসিরা
তাকে এক টুকরো কাগজ ও একটি পেন্সিলও দিত না। এ কারণে তিনি দেশলাইয়ের পোড়া
কাঠি সাজিয়ে গণিতের জটিল সমাধান করতেন। ভগবানের দোহাই দিল না লাখ লাখ
লোকের সামনে; বরং তারা মনে করল যে, তাদের কোথাও একটা ঘাটতি রয়ে গেছে। অতএব
মানুষকে তৎপর হতে হবে, চেষ্টা করতে হবে সমস্যার বিরুদ্ধে ভালোভাবে বেঁচে
থাকার স্বার্থে। ১৮৯৪ সালের ১ জানুয়ারি সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জন্ম। তাকে
গভীরভাবে স্মরণ করছি।

 

Courtesy of: http://www.samakal.com.bd/details.php?news=27&action=main&menu_type&option=single&news_id=223612&pub_no=924&type#.TwdXjw_dEQQ.facebook

Featured Insights:

http://en.wikipedia.org/wiki/S._N._Bose

 

ফেসবুক কমেন্ট


10 Comments

  1. বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে নিয়ে লেখা “কোয়ান্টাম সংখ্যাতত্ত্বের জনক” শিরোনামে খালেদা ইয়াসমিন ইতি লিখিত নিবন্ধটি একটি সুন্দর রচনা৤ এজন্য তাঁকে অনেক ধন্যবাদ৤ সাম্প্রতিক ইতিহাসই আমরা হারিয়ে ফেলেছি, অতীত ইতিহাস কতই-না মুছে গেছে৤ সেসব কে উদ্ধার করবে? বাংলার জলমাটির মতই নরম আমাদের ইতিহাস চেতনা৤

    মনোজকুমার দ. গিরিশ
    কোলকাতা
    ১৯/০১/২০১২

  2. বোসের কথা চিন্তা করলে গর্বে বুকটা এক’শ হাত ফুলে যায়..হায় ঢাকা ভার্সিটি তার দাম দিলনা!ঢাকা ভার্সিটিতে তার নামে একটি ভবন কিংবা হলের নামকরন করা দরকার।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use

আপনি চাইলে এই এইচটিএমএল ট্যাগগুলোও ব্যবহার করতে পারেন: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

*