|
পি.ডি.এফ. হিসেবে দেখুন।
ভূমিকা
জাপানে থাকি বেশ কয়েক বছর। এখানে জাপানি ভাষায় বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক সাময়িকি (সায়েন্টেফিক জার্নাল) দেখে আমি বিমোহিত হয়েছিলাম প্রথমে। এরপর আশ্চর্য হয়েছিলাম আমার প্রফেসরের শেলফের বইগুলো দেখে। চারিদিকে জাপানি বইয়ের সমারোহে কয়েকটা ইংরেজি বই দেখে কৌতুহলী হয়ে বই খুলে দেখি ভেতরে সব জাপানি ভাষায়, অথচ বইয়ের বাইরের মলাট ইংরেজিতে। পরবর্তীতে বাঙালী বড় ভাইদের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে, যে কোন ভাল পাঠ্যবই বের হওয়ামাত্র এখানকার অনুবাদকগণ সেগুলো নিজভাষায় অনুবাদ করে ফেলেন। ফলশ্রুতিতে ভাল ইংরেজি না জানা সত্ত্বেও সাধারণ ছাত্ররা এবং যে কোন আগ্রহী ব্যক্তি মূল জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয় না।
বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার প্রাসঙ্গিকতা
অপরপক্ষে বাংলাদেশের কথা চিন্তা করুন। আমাদের
উচ্চশিক্ষার সমস্ত উপকরণ ইংরেজিতে হওয়ায় শুধুমাত্র ইংরেজি জানা ছাত্ররাই
এতে ভাল করতে পারে। লাভের দিক হচ্ছে আমাদের দেশের উচ্চতর ডিগ্রীধারীগণ
মোটামুটি ভাল ইংরেজি জানেন। উল্টাভাবে বলতে গেলে, ভাল বা মোটামুটি ভাল
ইংরেজি না জানলে বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষালাভ করা দুরূহ।
বাংলাদেশে ইংরেজি জানা আরও বেশি দরকার। কোন বিষয় সম্পর্কে ভালভাবে জানতে
চাইলেও ঐ তথ্যসমৃদ্ধ বাংলা বই খুঁজে পাবেন না, কিন্তু ইংরেজি বই পাবেন বেশ
অনেকগুলো। ইদানিং অবশ্য কম্পিউটারের প্রায়োগিক বিষয়ের উপর বেশ কিছু বাংলা
বই এবং সাময়িকি বাজারে এসেছে। এই বইগুলো থাকাতে অনেক লোক উপকৃত হয়েছেন।
বইগুলো ইংরেজিতে হলে কিন্তু এ্যাত লোক উপকৃত হতেন না। অনেকের আগ্রহ থাকা
সত্ত্বেও ইংরেজি দেখে পিছিয়ে যেতেন। আর কোন বিষয়ে জানতে জ্ঞানের বিকল্প
নাই। বই পড়াটা তাই এ্যাত জরুরী। তাই দেশের সামগ্রীক উন্নতির জন্য আমাদের
দরকার বেশি বেশি প্রযুক্তিগত বই অনুবাদ করা।
কে হতে পারেন একজন ভাল অনুবাদক
একটা ব্যাপার মনে রাখা দরকার, যে কেউ কিন্তু
সুন্দর অনুবাদ করতে পারেন না। অনুবাদ করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সম্যক
জ্ঞান থাকা দরকার, তাছাড়া ভাষাগত প্রকাশভঙ্গিটা সহজবোধ্য হওয়া জরুরী। তা'
না হলে অনুবাদ করতে গিয়ে মূল অর্থ পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া অনেক
শব্দের আভিধানিক অর্থের চেয়ে প্রায়োগিক অর্থ বেশি উপযুক্ত, যেটা সংশ্লিষ্ট
বিষয়ে একজন দক্ষ বা অভিজ্ঞ ব্যক্তি ভাল জানেন। সুতরাং বিভিন্ন বিষয়ে
পেশাদার ব্যক্তি যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কোন বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ অনুবাদ করেন
তাহলে তা হবে সবচেয়ে ভাল এবং অপরের জন্য উপকারী। সবচেয়ে ভাল হয় যদি মূল
প্রবন্ধকার তার ইংরেজি প্রবন্ধ থেকে বাংলায় অনুবাদ করে দেন। কিন্তু এখানে
একটু চিন্তার ব্যাপার আছে।
যারা সাধারণত এই বৈজ্ঞানিক গবেষনামূলক প্রবন্ধ লেখেন ও পড়েন তাঁরা ঐ বিষয়ে
সম্যক জ্ঞান রাখেন। আর এই সম্যক জ্ঞান এসেছে ঐ বিষয়ে প্রচুর লেখাপড়া এবং
অভিজ্ঞতা থেকে। কাজেই একজন শিখতে আগ্রহী ব্যক্তি চাইলেই ঐ প্রবন্ধ পড়ে
সবকিছু বুঝতে না ও পারতে পারেন। কারণ ঐ বিষয় বোঝার জন্য প্রয়োজনীয়
বিষয়গুলি পড়ার সুযোগ হয়নি। দূঃখের ব্যাপার হল, ঐ বিষয়ভিত্তিক বইগুলিও
ইংরেজিতে।
কাজেই অনুবাদ করতে চাইলে একেবারে মূল পাঠ্যবই থেকে অনুবাদ করে আসতে হবে।
পাঠ্যবই অনুবাদের কাজটা ছাত্রগণ করতে পারবে অনায়াসে। বিভিন্ন
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আগ্রহী ছাত্রগণ মিলে একজন শিক্ষকের তত্বাবধানে
ইংরেজি বইগুলি অনুবাদ করতে পারেন। এই বইগুলো যদি ইন্টারনেটে থাকে তাহলে
অনেক আগ্রহী ব্যক্তি এটা পড়ে উপকৃত হবেন। আর ইংরেজিতে দূর্বল ছাত্রগণ
বিষয়টা আরও ভালভাবে হৃদয়াঙ্গম করতে পারবেন।
প্রস্তাবনাসমূহ
আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিজ ভাষায়
বিজ্ঞান চর্চা। বিজ্ঞান চর্চা মানে শুধু বাংলায় বিভিন্ন বিজ্ঞান ও
প্রযুক্তিগত বই পড়া নয়। আমাদেরকে বাংলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সভা বা
আলোচনামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক সভাসমিতিতে
অংশগ্রহনের জন্য বিষয়গুলি ঝালাই/চর্চা করে নেয়া যাবে, তাছাড়া নিজ ভাষায়
ব্যপারগুলি বুঝার ফলে, ইংরেজিতে আন্তর্জাতিক সেমিনারেও অনেক বক্তব্য দ্রুত
অনুধাবন করা সহজ হবে।
পাশাপাশি বাংলায় গবেষনামূলক প্রবন্ধের পত্রিকা বা সাময়িকি প্রচার করতে
হবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণামূলক বিষয়ের ক্ষেত্রে তাদের সনদ দেয়ার
পূর্বশর্ত হিসেবে এই রকম বৈজ্ঞানিক সাময়িকিতে বাংলা অথবা ইংরেজিতে প্রবন্ধ
প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
বাংলায় বিজ্ঞান সাময়িকি
এই মুহুর্তে বাংলায় তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক পত্রিকা
আছে কিন্তু কোন বৈজ্ঞানিক সাময়িকি নেই। আর বর্তমানে অন্যান্য ভাষার মত
একটি সম্পুর্ন এবং বিষয়ভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কারণ
আমাদের দেশে বিজ্ঞান সাময়িকি ভরিয়ে দেয়ার মত যথেষ্ট পরিমান মৌলিক গবেষণা
হচ্ছে না। আর অপরপক্ষে ঐ সাময়িকিতে প্রকাশযোগ্য প্রবন্ধ হৃদয়াঙ্গম করার
জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানেরও দরকার আছে। তাই সাময়িকির গড়নটা এমন হওয়া উচিৎ যেন
এতে মৌলিক গবেষণার পাশাপাশি অন্যান্য সাধারণ জ্ঞানমূলক প্রবন্ধ থাকে।
তাহলে একেবারে সাধারণ থেকে অগ্রবর্তী সবশ্রেণীর পাঠকের চাহিদা মেটাতে
সক্ষম হবে। অর্থাৎ বিষয়বস্তুর বিভিন্নতা হওয়া উচিৎ ইংরেজি ভাষার জনপ্রিয়
বিজ্ঞান সাময়িকি সায়েন্স বা নেচার এর মত।
প্রথমদিকে হয়ত সাধারণ তথ্যমূলক প্রবন্ধ বেশী আসবে আর মৌলিক গবেষণামূলক
প্রবন্ধ থাকবে অনেক কম। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মৌলিক গবেষণার পরিমান
বাড়বে এবং এমন সময় আসবে যে হয়ত, বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধের জন্য আলাদা শাখা বা
সাময়িকি বের করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে। তবে এ ধরনের একটি সাময়িকি বের
করার জন্য সর্বপ্রথমে একটি প্রবন্ধ প্রকাশের বা লিখার নির্দিষ্ট একটা ছক
বা ধরন নির্ধারণ করা প্রয়োজন। যেমন, লেখকের নাম কিভাবে দেয়া হবে, তার
প্রাতিষ্ঠানিক সংযুক্তি, ইমেইল ঠিকানা, প্রবন্ধের মুখবন্ধ, ভুমিকা, মূল
অংশ, চিত্র, চিত্রের নামকরণ, ছকের নামকরণ, সংখ্যামূলক তথ্যছকের ধরন,
উপসংহার, কৃতজ্ঞতা এবং তথ্যসূত্র লেখার ধরন কেমন হবে তা পূর্বনির্ধারিত ছক
বা ফরমেট মেনে লিখতে হবে। তাছাড়া বিভিন্ন ইংরেজি শব্দের যথাযথ বাংলা
অনুবাদের জন্য একটি নীতিমালা এবং বৈজ্ঞানিক পরিভাষা বা অভিধান প্রনয়নেরও
দরকার রয়েছে।
তাছাড়া লেখার মানদন্ড নির্ধারন করার জন্য লেখাগুলিকে উক্ত বিষয়ের বিশেষজ্ঞ
দ্বারা পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে। দেশে এবং বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের
বাঙালি শিক্ষক এবং খ্যাতনামা গবেষকগণ এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে
পারেন। এতে করে দেশে থাকা প্রযুক্তিবিদগণ, প্রবাসী বাঙালি গবেষক ও
প্রযুক্তিবিদগণের সাথে আরও কার্যকর ভাবে যুক্ত হতে পারবেন। দেশের মেধা
দেশের কাজে লাগার একটা চমৎকার ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে।
|
আমি বিশ্বাস করে সামনের বিশ্বের সাথে পাল্লা দেবার জন্য আমাদের প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিতে হবে আর সেই সাথে মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চাকে বাড়াতে হবে। সেইক্ষেত্রে এইরকম বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক জার্নাল বেশ ভাল হবে বৈ কি।
বিজ্ঞানী.com এর প্লাটফর্মকে ব্যবহার করে আমরা এই ক্ষেত্রে অগ্রণীভূমিকা পালন করতে পারি। আমরা যারা বিজ্ঞানীরা আছি তারা তাদের পেপারগুলি ইংরেজীতে বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত করার পাশাপাশি বাংলাতে বিজ্ঞানী.com এ প্রকাশিত করার অনুরোধ করছি। তারপরে যখন আমাদের সেই সংখ্যাটি বেড়ে যাবে তখন এই রকম জার্নাল প্রকাশিত করতে পরি। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানী.com অফলাইনে (প্রিন্ট আকারে)প্রকাশিত করার ইচ্ছে রয়েছে। সেরকম content যদি অনেক হয় তবেই সেই কাজটি করা যেতে পারে।
এখন আমাদের জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিজ্ঞানীদের বাংলা ভাষায় তাদের গবেষনার কাজকে তুলে ধরার জন্য।
এই বিষয়ে আরো আলোচনা করার জন্য পাঠকদের কাছ থেকে মন্তব্য আশা করছি।
পরিশেষে ধন্যবাদ জানাচ্ছি মিয়া মোহাম্মাদ হুসাইনুজ্জামান -কে সুন্দর একটি আইডিয়া নিয়ে আনার জন্য। তবে আইডিয়াটি বাস্তবে রূপ দিতে হলে সবার সহযোগীতা প্রয়োজন। আশা করি সবাইমিলে আমরা এগিয়ে আসব।