|
বেশ কয়েকবছর ধরেই দেখছি, যখনই বাংলাদেশের আইটি নিয়ে কথা হয়, তখনই কথায় কথায় সবাই বলে যে আমাদের দেশের ছেলেরা কম্পিউটার প্রতিযোগীতায় ভাল করছে। অথচ আন্তর্জাতিক বিশ্ব বাজারে আমাদের প্রতিযোগীতায় নামতে হলে আমাদেরকে বিশ্বের মানের সাথে যুদ্ধ করতে হবে ও তাদের সাথে প্রতিযোগীতা করতে হবে। কোন কম্পিউটার প্রতিযোগীতায় ভাল করা এক কথা আর বিজনেসে সার্থক হওয়া আরেক কথা। আজকাল বিভিন্ন বুদ্ধিজীবি, মন্ত্রী ও আমলারা প্রায়শ বলে বেড়াচ্ছেন আমাদের আইটি সেক্টরের ভবিষ্যত খুবই উজ্জ্বল। কত কোটি টাকার রফতানী হবে তাই নিয়ে হিসেব কষেন তারা। এ দেখি হাসের ডিমের সেই গল্পটার মত। মনে মনে শুধু লাভের হিসাব আর কিছুদূর যাবার পরে ডিমগুলিই ভেঙে সব বরবাস্ত! আমরাও একই রকম ভূল হিসাব কষছি। এইকথা শুনছি অনেক বছর ধরেই, আর আশার কথা শুনাবেন না, দয়া করে সত্যি চিত্রটা তুলে ধরুন।
আমাদের দেশের মেধাবী ছেলেরা যে সমস্ত প্রতিযোগীতায় জিতছে তা নেহাতই এমেচার
জাতীয় প্রতিযোগীতা। বিশ্বে খুব কম লোকেই সেগুলিকে চিনে। কি আহত হলেন এই
কথা শুনে? বিদেশী কোন বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন। সিলিকন ভ্যালিতে ওই
প্রতিযোগিতার কথা কেউ জানেননা। কম্পিউটার জগতের বাজারে যদি দেশের পরিচিতি
বাড়াতে চান তবে প্রতিযোগীতায় নয় বরং ভাল সফট তৈরী করে, সুন্দর কোন
বাণিজ্যিক আইডিয়া নিয়ে আসতে হবে। আমি আমাদের মেধাবী ছেলেদের কৃতিত্বকে ছোট
করে দেখছিনা, তবে বলতে চাচ্ছি বিশ্বের বাজারে নামতে হলে আমাদেরকে আরো
প্রফেশনাল হতে হবে।
আর আমাদের দেশের কম্পিউটার কম্পানিগুলি, যারা কিছু কিছু সফটওয়ার তৈরী
করছে তারা মূলত অভ্যান্তরীন বাজরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিছুদিন পরে তারা
হয়তো একটা ওয়েবসাইট তৈরী করল, তারপরেই তারা ভেবে বসল আইটি-তে খুব বড় কিছু
করে ফেলল। তারপরে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সেই ওয়েবসাইটও বন্ধ হয়ে
যায়।
কোন সফট তৈরী করা কিংবা পোগ্রামের কোন কোড লিখাকেই শুধু মাত্র আইটি সেক্টর
বলে অনেকেই ভুল করেন। আসলে আইটির ব্যবসার সাথে কোড লিখার পোগ্রামারের
পাশাপাশিপ্রোজেক্ট ম্যানেজার, বিপনন, অর্থ, ব্যাবস্থাপনা এইগুলি জড়িত।
সবগুলির এক্সপার্ট দরকার। এইক্ষেত্রে আমার পরিচিত এক প্রতিষ্ঠান বেশ
কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে প্রোজেক্ট ম্যানেজার খুঁজছে কিন্তু তারা তেমন কোন
যোগ্যপ্রার্থী পাচ্ছেননা। এইবার বুঝুন আমাদের অবস্থাটা।
যে কথা বলছিলাম, আমরা কি দেশের ছোট গন্ডি থেকে বের হয়ে আরো বড় কিছু করতে
পারিনা? অবশ্যই পারি। আমাদের যে বেসমেন্ট আছে তাকে পক্ত করতে হবে। পক্ত না
করেই আগেই প্রচারণা নামলে যা হবার তা হয়। মনে করা যাক, একজন শিল্পী, যার
কিছু প্রতিভা আছে। কিন্তু তাকে প্রোফেশনালভাবে কাজ করতে চাইলে, তাকে অনেক
ঘষামাজা করতে হয়। তা না করেই যদি প্রথমেই প্রচারণার জন্য টিভি, সিনেমায়
নেমে পড়ে, তখন দেখা যায় তা দীর্ঘ যাত্রায় তিনি টিকেননা। দেখুন যে সমস্ত
শিল্পীরা এখনও প্রোফেশনালভাবে সমাদৃত, তারা কিন্তু নিজেদের ঘষেমেজে অনেক
কষ্টে নিজেদের তৈরী করেছে। আমি আইটির ক্ষেত্রেও একই কথা বলব। আমাদের মধ্যে
হয়তো প্রতিভা আছে, আমাদের ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় ভাল করছে, তবে
তাকে আরো ঘষেমেজে বিশ্ববাজারে আমাদের টিকে থাকার জন্য আমাদের কাজ করতে
হবে। খামাখা নাম কামাবার জন্য আইটি নয়।
ওয়েবসাইটকে আমরা বিজ্ঞাপনের বিকল্প হিসাবেই দেখি, সেখানে কম্পানিগুলি কি
ধরনের কাজ করছে, কি কি বিষয়ের এক্সপার্ট তাই খুটিনাটি তথ্য উল্লেখ থাকা
প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে আইটি সংক্রান্ত
কম্পানিগুলি কোন তথ্য উপস্থাপন না করে ভাববাচ্যে অনেক কথা লিখে। যেমন হয়ত
লিখা আছে, মাল্টিমিডিয়া এক্সপার্ট। এটি দিয়ে অনেক কিছুই বোঝাতে পারে। আর
মাল্টিমিডিয়া ক্ষেত্রটিও বিশাল। মাল্টিমিডিয়ার কি ধরনের কাজ তারা করে? কি
ধরনের সফটওয়ার দিয়ে তৈরী করে, কতজন এক্সপার্ট সেই কম্পানিতে আছে? কেও
বিয়ের ভিডিও এডিট করেও মাল্টিমিডিয়া বলতে পারে, আবার কার্টুন কিংবা
এনিমেশন তৈরী করেও বলতে পারে তা মাল্টিমিডিয়া। কি কি কাজ তারা করছে তা
করেছে তার উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। তা যতই সামান্য হোকনা কেন? তবেই যারা কাজ
করাতে চাইবে তারা এগিয়ে আসবে। যেমন, আমার শহরে খুব ছোট একটা কম্পানি আছে,
তারা শুধু মাত্র লগো তৈরী করে। তাদের ওয়েবসাইট দেখলে দেখতে পাবেন, তারা কি
কি লগো তৈরী করেছে, কত দিন সময় লাগে লগো তৈরী করতে এবং তার জন্য কিরকম খরচ
হয় তার খুটি নাটি সমস্ত তথ্যই আছে। সেই ওয়েবসাইটটি দেখে, যারা লগো তৈরী
করে নিতে চান খুব স্বাভাবিক ভাবেই তাদের সাথে যোগাযোগ করবেন। অথচ বাংলাদেশ
হলে লিখা থাকবে, আমরা অনেক প্রতিষ্ঠানের লগো তৈরী করি। কত খরচ? কত দিন
লাগবে কি কাজ করেছে- তা কখনই উল্লেখ করবেনা। হোক তা দুটি/তিনটি কাজ। যারা
কাজ করিয়ে নিতে চাইবে, তারা তাদের উদাহরণ দেখেই বুঝতে পারবে কেমন
প্রোফেশনাল তারা।
এই প্রসঙ্গে একটি অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের বলি। কিছুদিন আগে আমরা একটা
ওয়েবসাইট তৈরী করার কাজ পেয়েছিলাম। ভাবছিলাম বাংলাদেশের কোন কম্পানি দিয়ে
কাজটি করাব। আমাদের দেশের ছেলেরা কাজ পাবে। ইন্টারনেটে ঘাটা ঘাটি করে অনেক
কম্পানি পেলাম, যেখানে সবাই বলছে, তারা ওয়েবসাইট তৈরীতে এক্সপার্ট এবং
অনেক বড় বড় কম্পানির কাজ তারা করেছে? এই "অনেক" শব্দটির মানে কিন্তু
অনেককিছুই হতে পারে। দুটি কিংবা তার বেশী হলেও অনেক বলা যায়। সংখ্যার
উল্লেখ নেই কেন? উদাহরণ থাকা প্রয়োজন। কয়েকজনকে ইমেইল দিলাম। বুঝতেই
পারছেন, কোন উত্তর নেই। আর যাদের সাথে যোগাযোগ হল, তাদের কথা বার্তা শুনে
বুঝতেই পারলাম তারা কতটুকু প্রোফেশনাল। তারপরে প্রবাসের এক জুনিয়রকে দিয়ে
কাজটি করিয়ে নিলাম।
এই থেকে উদ্ধার পাবারা উপায় কি? আসলে যেটি বল্লাম তা হল, আমাদের আরো ঘষে
মেজে প্রোফেশনাল হতে হবে? যারা প্রবাসে আছেন, বিভিন্ন আইটি এর কম্পানিতে
কাজ করছেন, তারা এই ক্ষেত্রে গাইড দেবার কাজ করতে পারেন। কেননা তারা জানেন
বিশ্ববাজারে টিকে থাকার জন্য আমাদের কি করতে হবে। আর আমাদের ছেলে মেয়েরা
আইটি এর প্রযুক্তিগত দিকগুলি যতটা শিখছে, ম্যানেজমেন্টের জিনিসগুলি
শিখছেনা। যেমন প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কিভাবে করতে হয়, প্লানিং কিভাবে
করতে হয়, এই জিনিসগুলি আমাদের ছেলেদের শিখা খুবই প্রয়োজন।
যারা উঠতি কিশোর/কিশোরী বাংলাদেশে বসে আছে হাতের কাছে ভাল রিসোর্স
পাচ্ছেননা। কিংবা দিকনিদর্শনা পাচ্ছেননা। তারা দুটি কাজ করতে পারেন।
১. প্রবাসের বেশি কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা আপনাদের গাইড করবার জন্য
হাত বাড়িয়ে আছে। তাদের সাথে যোগাযোগ করে বুদ্ধি পরামর্শ নিতে পারেন।
কিভাবে বিশ্ববাজারের কাজ পাবেন - সেই সমন্ধে তারা সাহায্য করতে পারেন। এমন
কিছু সংস্থা হল বাংলা আইটি http://www.banglait.org
। বাংলাআইটি উদারহস্তে হাত বাড়িয়ে রয়েছে পরামর্শ দেবার জন্য। এছাড়ারও রয়েছে Bangladesh Association of Software
& Information Services (BASIS) http://www.basis.org.bd/
। আর ইমেইলে পরামর্শের জন্য কিছু মেইলিংলিস্টে যোগ দেবার পরামর্শ দেব। এসব
মেইলিংলিষ্টে অনেক প্রোজেক্টের জন্য লোক খোঁজা হয়। এছাড়াও অনেক রিসোর্স
পাবেন এই মেইলিংলিষ্টগুলিতে, যা আপনারা জীবনকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। এমন কিছু
মেইলিংলিস্ট নিম্নে দেয়া হল। এইগুলিতে যোগদেবার জন্য পাশের ইমেইলগুলিতে
ইমেইল দিন:
ICT of Bangladesh :
স্প্যামবটের হাত থেকে এই ইমেল ঠিকানা সুরক্ষিত আছে। পড়ার জন্যে জাভাস্ক্রিপ্ট অন করুন।
Banglaict :
স্প্যামবটের হাত থেকে এই ইমেল ঠিকানা সুরক্ষিত আছে। পড়ার জন্যে জাভাস্ক্রিপ্ট অন করুন।
২.
আরেকটি সহজ উপায় হল ওপেনসোর্সের কোন প্রোজেক্টে অংশ নিয়ে কিভাবে প্রোজেক্ট হয়, কিভাবে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট হয় তা শিখতে পারেন।
অপেন সোর্স এর ক্ষেত্রে সব ধরনের রিসোর্স, ডকুমেন্ট ও পোগ্রামিং এর কোড
উন্মুক্ত ও সহজেই পাওয়া যায়। তাই এই ভাবে শিখার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আপনি
হয়তো সরাসরি কোড লিখতে পারছেন না, চিন্তা করবেননা। অংশ নিয়ে পর্যবেক্ষন
করে দেখুন তারা কিভাবে কাজ করে। অপেনসোর্সের ক্ষেত্রে আরেকটি সুবিধা হল,
আপনার যদি ভাল কোন আইডিয়া থাকে, সেটা দিয়ে নিজেই শুরু করতে পারেন কোন
প্রোজেস্ট। কয়েকদিনের মধ্যেই দেখবেন, সারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে
অনেক বাঘা বাঘা পোগ্রামার-রা আপনার প্রোজেস্টে অংশ নিচ্ছেন। এইভাবে
অপেনসোর্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাম ছড়াতে পারেন। আইটি এর জগতে কাজ পাবার
জন্য, সবাই জানতে চাইবে আপনি কি করেছেন। "আপনি কি করতে পারবেন"- তা নিয়ে
কারো মাথা ব্যাথা নেই। আপনার আগের কাজগুলি দিয়েই আপনাকে নতুন কাজ যোগাড়
করে নিতে হবে। অপেনসোর্সে যোগ দেবার জন্য নিম্নের সাইটগুলি বেশ তথ্যবহুল:
http://www.opensource.org/
http://sourceforge.net/
http://en.wikipedia.org/wiki/Open_source
http://developer.apple.com/opensource/index.html
http://code.google.com/
http://www.ostg.com/
http://www.intel.com/technology/computing/opencv/index.htm
http://opensource.hp.com/index.php
http://www.iosn.net/
এইক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, অপেনসোর্সকে জনপ্রিয় করার জন্য সবথেকে
সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ অপেনসোর্স নেটওয়ার্ক, যাদের ওয়েবসাইট হল http://www.bdosn.org/ ।
তাই বাংলাদেশের উদায়মান কিশোর/কিশোরী যারা তথ্যপ্রযুক্তিতে কাজ করতে চান
তাদের আহবান জানাই, চলুন আমরা আপেনসোর্স প্রোজেক্টে অংশ নিয়ে নিজেদের আরো
প্রোফেশনাল ভাবে গড়ে তুলি। একজন বাংলাদেশী হিসাবে কোন অপেনসোর্স
প্রোজেক্টে অংশ নিয়ে দেশ বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম আরো বাড়াতে পারবেন। যখনই
কোন প্রোজেক্টে আপনি ভাল কাজ করবেন তখন দেশ-বিদেশ থেকে কাজের আহবান পাবেন।
প্রশ্ন তুলতে পারেন বিনামূল্যে কাজ করে কি পাবেন? পাবেন "অভিজ্ঞতা" যা
বাংলাদেশের সল্প পরিসরে পাবেননা। অর্থ দিয়ে যদি কোচিং সেন্টারগুলিতে শিখতে
পারেন তবে বিনামূল্যে এইভাবে কাজ শিখার সুযোগ হাতছাড়া করবেন কেন?
বিশ্ব বাজারে টিকে থাকার জন্য আমাদের অনেকদূর পথ চলতে হবে। অনেক কাজ
করতে হবে। কোন কাজ না করেই, ফাকা মাঠে বুলি ছড়িয়ে হয়তো রাজনীতিবিদ হওয়া
যাবে। আইটি তে কোন কাজ পাওয়া যাবেনা। আমরা বিশ্বাস সামনে সুন্দর আইডিয়া
নিয়ে বাংলাদেশের ছেলে মেয়েরা এগিয়ে আসবে।
- ৯ই ফেব্রুয়ারী ২০০৭
|