|
অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের ছবিটার দিকে যদি কখনো আপনি গভীর ভাবে তাকান তবে ওই স্বপ্নদৃষ্টি, মাথাভর্তি উড়ো উস্ড়্গো-খুস্ড়্গো সাদা চুল, শিশুসুলভ কিন্তু অনেকটা শ্লেষ মাখা হাসি হাসি মুখ দেখে ঠিক কার কথা যেন মনে হবে। তিনি সত্যিকার অর্থে মানব মনন আর চিন্তাশীলতার সর্বোকৃষ্ট উদাহরণ ছিলেন। আপেক্ষিক তত্ত্বের মত কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব যে তাঁর একার চিন্তার ফসল তা ভাবলে শিহরিত হতে হয়।
আইনস্টাইন জন্মেছিলেন ১৮৭৯ সালে, জার্মানীর উলম শহরে। তিনি কোন মহাজ্ঞানী
ছাত্র ছিলেন না। অপেক্ষাকৃত দেরি করে কথা বলা শুরু করে তিনি থেমে থেমে
তাঁর ছোট ছোট বাক্য দিয়ে কথা সাজাতেন। ঠিক যেন তাঁর ছোট বোনের দেখা
সেই শিশু আইনস্টাইন যে শিশু ছোট ছোট কার্ড দিয়ে গভীর মনোযোগে ঘর
বানাতেন। তাঁর এমন ভাবনার জগতে জলতরঙ্গ রূপে হাজির হতো তাঁর বাবা
হারম্যান আইনস্টাইন। তিনি তাঁকে খুব ছেলেবেলা ছোট্ট একটি কম্পাস যন্ত্র
দিয়ে তাঁর মনে এমন এক উপলব্ধি এনে দিয়েছিলেন যেন বালক আইনস্টাইনের মনে
হতো আপাত দৃষ্টির প্রাকৃতিক ঘটনার পেছনে কোন রহস্যময় অনুঘটক আছে। বারো
বছর বয়সে হাতে পাওয়া ইউক্লিডের সমতল জ্যামিতির বইটা কিংবা এলজেব্রা বইটিও
তাঁকে যেন সেই অনুঘটকের অস্তিত্ব সম্পর্কই আরো সদ্ধিহান করে তুলতো।
পিয়ানাবাদক মা পলিনের কাছ থেকে সুরবোধের সঙ্গে পরিচিত হওয়া আইনস্টাইনের
সারা জীবনের সঙ্গী হয়েছিল মোজার্টের সুর আর বেহালা।সতেরো বছরের কিশোর
আইনস্টাইনকে যে শুধুমাত্র পিতামাতার সঙ্গে বাস করার জন্য ইতলীতে ছুটে যেতে
হয়েছিল তা নয়, স্ড়্গুলের বিষাদ শিক্ষা আর জার্মানীর বাধ্যতামূলক সামরিক
প্রশিক্ষণও এর কারণ।যুদ্ধকে আজীবন অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে গেছেন এই মনীষী।
তাঁর নিজের কথায়, "মানুষ হত্যা আমার কাছে নিদারুন বিরক্তিকর একটি ব্যাপার।
আমার এই মনোভাব কোন বিজ্ঞ চিন্তা থেকে আসেনি। এর মূলে রযেছে ঘৃণা আর
নিষ্ঠুরতার প্রতি আমার তীব্র বিদ্ধেষ।"১৯০৫ আর ১৯১৫ সাল দুটি শুধু
আইনস্টাইনের জন্য নয়, সমগ্র মানব জাতির জন্যে এক অবিস্মরণীয় সময় হয়ে
চিরকাল বেঁচে থাকবে। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব আর সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব
আইনস্টাইনের চোখে শুধুমাত্র একটি নতুন ধারণা নয়, কি করে ইশ্বর এই
বিশ্বব্রহ্মান্ড তৈরী করলেন তার সন্ধানে এ যেন তাঁর কৌতূহলী মনের এক
ব্যক্তিগত উদ্যোগ।
মানুষের ব্যক্তিগত ইশ্বর ভাবনায় তাঁর আস্থা ছিল না। তিনি নিজেই বলেছেন যদি
তাঁর মধ্যে ধর্মানুভূতি বলে কিছু থেকে থাকে তবে তা শুধু- অসীম শ্রদ্ধাবোধ
সেই বিজ্ঞানের জন্য যা বিশ্বব্রহ্মান্ডের রহস্য উঞ্ছঘাটনে নিরন্তন চেষ্টা
চালাচ্ছে। ধর্ম, বিধাতাপুরুষ, পরকাল এসব নিয়ে তিনি নিজের মুখেই বলেছেন,
মৃত্যুর পর শাস্তির ভয়ে মানুষ জীবিত অবস্থায় পাপ করা থেকে বিরত থাকবে এটা
তিনি আশা করেন না। তাঁর কাছে এধরণের যুক্তির কোন মূল্য নেই। মানুষকে
সুপথে রাখতে পারে আইনস্টাইনের ভাষায় সেই মানবিক মূল্যবোধ যা তাঁর হßদয়ে
প্রতিনিয়ত উচ্চারিত হয় এমনভাবে- তোমার সম্পূর্ণ অস্থিত্বের মূলে রয়েছে
অপরের ঘাম ঝরা কঠোর পরিশ্রম। হাজারো জীবিত আর মৃত মানুষের কর্মের সুফল
তুমি- মানুষ আজ প্রতিনিয়ত ভোগ করছো। শিক্ষাই শুধুমাত্র মানুষের মধ্যে এই
দায়ীত্ববোধক উপলদ্ধি এনে দিতে পারে। ধর্ম বা মৃত্যুভয় নয়।
ইহুদী ধর্মালম্বী মানুষ হিসেবে তিনি ধর্মীয় আচার-আচরণ পালন না করলেও
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীকে একবার চিঠিতে জানিয়েছিলেন যে, ইহুদী ধর্মালম্বী
মানুষদের সাথে আত্নীয়তার বন্ধনই তাঁর সবচাইতে দৃঢ় মানবিক বন্ধন। হিটলারের
ফ্যাসীবাদী শুদ্ধি অভিযান থেকে বহু ইহুদীকে বাঁচাতে তিনি ব্যক্তিগত ভাবে
উদ্দ্যোগী হয়েছিলেন। তিনি সার্বজনীন ইহুদী আবেদক রূপে বৃটিশ অধিকৃত
প্যালিস্টাইনকে ইহুদীদের জন্য পৃথক আবাসভূমি হিসেবে দাবী করতে সচেষ্ট হন।
কিন্তু কখনো এই আইনস্টাইনই নিজেকে নিঃসঙ্গ এক পরিব্রাজক আখ্যায়িত করে
বলেছেন, "আমি কোনদিনই সারা অন্তর দিয়ে দেশ, জন্মভূমি, বন্ধু-বান্ধব,
এমনকি ঘনিষ্ট পরিবারের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত ছিলাম না। বরং এসব সম্পর্ক আমার
মধ্যে একাকীত্বের একটা প্রয়োজনীয়তা এনে দিয়েছে।"
তবে একাকী তিনি কি ছিলেন? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনিতে হিটলারের
আগ্রাসী মনোভাবে পশ্চিমা দুনিয়া যখন দিশেহারা তখন ভর-শক্তির সাম্যের
আবিষ্ড়্গারকর্তা আইনস্টাইনের শরণাপন্ন হলেন লিও শিলার্ড, ইউজিন ভিগনার,
এডওয়ার্ড টেলারের মত পদার্থবিজ্ঞানীরা। তাঁরা তাঁকে বোঝালেন ফ্যাসীবাদের
বিষদাঁত ভেঙে দিতে," অসম্ভব ক্ষমতাশীল নতুন ধরণের বোমা" বানান প্রয়োজন।
আইনস্টাইন তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে চিঠিতে জানালেন যে,
সাম্প্রতিক কিছু গবেষণার ফলে এধরণের মারণাস্ত্র বানান সম্ভবতঃ সম্ভব।
পরবর্তীতে পারমাণবিক বোমার ভয়াবহতা উপলব্ধি করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এই
বোমা তৈরীর কৌশল গোপন রেখে অপরের উপর প্রয়োগ করা বন্ধ করে সকল দেশের
মধ্যে বোমার বৈজ্ঞানিক কৌশল প্রদর্শন করার আহবান জানান। তিনি পৃথিবীর
মানুষ আর রাজনৈতিক নেতাদের পারমাণবিক বিজ্ঞানে সচেতন করে তোলা ও
পারমাণবিক বোমা তৈরী না করার কথা বলেন। ১৯৫৫ সালে বার্টÝান্ড রাসেলের
সঙ্গে যৌথভাবে তিনি শীতলযুদ্ধের আশংকাজনক পরিস্থিতিতে পারমাণবিক যুদ্ধ
রোধে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এক আন্দোলন গড়ে তোলেন।
সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব প্রত্যক্ষ করে আইনস্টাইন আলোড়িত হন। পঞ্চাশের দশকে
যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে "কমিউনিস্ট" আখ্যা দিয়ে ধরপাকড় চলছিলো। আইনস্টাইন এর
বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেন, ব্যক্তিগত
পুঁজির দাপটে গণতান্ত্রিক সমাজ টিকতে পারে না। ফলে ব্যবসায়ীদের অর্থে গড়ে
উঠা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেসব আইন তৈরী করে তা সাধারণ মানুষের কোন কাজে
লাগে না। এমতাবস্থায় তাঁর ভাষায়, পুঁজিপতিরা গণমাধ্যমের উপর প্রত্যক্ষ বা
পরোক্ষ নিয়ন্ত্রন চালায়। এসবের ফলে সাধারণ মানুষ তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা
ব্যবহারের খুব একটা সুযোগ পায় না।
আইনস্টাইন সমাজের পুঁজিপতিদের এই প্রতিযোগীতাপূর্ণ ব্যবসায়ীক মনোভাব
প্রত্যক্ষ করে বলেছিলেন যে, এমন অসুস্থ প্রতিযোগীতা মানব ক্ষমতার এক
নিদারুণ অপচয়। শিক্ষাব্যবস্থাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পরে। ছাত্র-ছাত্রীরা
তাদের পরীক্ষার ফলাফলটাকেই পরবর্তী কর্মজীবনের চাবিকাঠি বলে ধরে নেয়।
চিন্তাশীলতা গড়ে উঠতে পারে না। এসব থেকে মুক্তির জন্যে তিনি সমাজতান্ত্রিক
অর্থনৈতিক কাঠামোর অন্বেষণ করে গেছেন।
বিশ্বশান্তির জন্য তিনি তাঁর মতে, "শান্তিপূর্ণ উন্নয়নে" বিশ্বাসী তৎকালীন
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন- দেশগুলোকে নিয়ে
একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রস্তাব করেন। যার কাজ হবে যুদ্ধদেহী নাৎসী
জার্মানীর মতো দেশের বিরোধীতা করা। আইনস্টাইন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের
কথাও বলতেন। নানান সময়ে বিশ্বশান্তির জন্য তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থার
প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন।
১৯৩৬ সালে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী এলিসা আইনস্টাইনের মৃত্যুর পর তিনি তাঁর
ছোট বোনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সস্টন ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্স
স্টাডিজের কোয়ার্টারে থাকতেন। আত্নভোলা এই মানুষটির কর্মকান্ড
অবিশ্বাস্য রকমের শিশুসুলভ ছিল। লোকজন তাঁকে দেখার জন্য এতো পাগল কেন
এটা তিনি বুঝতে পারতেন না। তিনি বলতেন কেউ যদি আমার তত্ত্ব নাই বোঝে তবে
আমাকে পছন্দ করে কেন? তিনি নিজেই কোয়ান্টাম মেকানিক্স বিজ্ঞানের সূচনা
করলেও এর কিছু মৌলিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে আজীবন দ্বিমত পোষণ করে গেছেন।
তিনি তাঁর জীবনের শেষ বছরগুলোতে প্রাকৃতিক বলগুলোর একীভূত তত্ত্বের উপর
গবেষণা করছিলেন। তাঁর মৃত্যুর কয়েকদিন আগে আব্রাহাম পায়েস তাঁর সঙ্গে দেখা
করতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। শেষবার আইনস্টাইনকে দেখে তিনি পিছন ফিরে চলে
আসার সময় দেখেন এরই মধ্যে আইনস্টাইন হাসপাতালের বেডে শুয়ে তাঁর একীভূত
তত্ত্বের গবেষণা কাগজে মগ্ন হয়ে গিয়েছেন।
এমন বিজ্ঞানে পরমাত্না সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেন, তিনি নিজে
সত্যানুসন্ধানী বিজ্ঞানীদের দল ছাড়া অন্য কোন দলে থাকতে পছন্দ করেন না।
কারণ সকল কালেই সত্যানুসন্ধানীদের দল খুব বেশী বড় হয় না।
অ্যালবার্ট আইনস্টাইন মারা যান ১৮ ই এপ্রিল ১৯৫৫ সালে। তাঁর দেহভস্ম
অজ্ঞাত স্থানে ছড়িয়ে দেয়া হয় এবং এই বিজ্ঞানীর বাসস্থান তাঁর ব্যক্তিগত
ইচ্ছানুসারে যাদুঘর করা হয়নি। আর দশটা আবাসিক কোয়ার্টারের মত তা এখনও
প্রিন্সস্টন বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবহার করে যেখানে এককালে সর্বকালে
সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন থাকতেন।
কপিরাইট: ছবিটি Oren J. Turner এর তোলা এবং উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া হয়েছে। লিংক
|