লগ-ইন

হোম arrow কলাম arrow “প্রযুক্তি” সমস্যা নয়, সমস্যা হয় একে ঠিকমতো কাজে লাগাতে
“প্রযুক্তি” সমস্যা নয়, সমস্যা হয় একে ঠিকমতো কাজে লাগাতে | প্রিন্ট |
লিখেছেন ড. মশিউর রহমান   
Wednesday, 14 November 2007

অনেকেই বলে থাকেন যে আমাদের দেশ প্রযুক্তিতে অনেক পিছিয়ে আছে কিংবা প্রযুক্তির খুবই অভাব। আসলে আমি বলতে চাই, দেশের উন্নয়নের জন্য প্রযুক্তি কোন সমস্যা নয়। প্রযুক্তি আমাদের চারধারেই আছে, সেটিকে সঠিক জায়গায় সঠিক ভাবে প্রয়োগ করার বড় প্রয়োজন। আপনার হয়তো আমার কথার সাথে দ্বিমত পোষন করবেন কিন্তু আমার কথা যদি শেষ পর্যন্ত শোনেন তবে বুঝতে পারবেন, কেন আমি এই কথা বলছি।

 

এই যে আমাদের মত দেশেও মোবাইল প্রযুক্তি এত প্রচলন হলো এবং এর মাধ্যমে এত কর্মসংস্থান হল, তা কিভাবে হল? আপনি কি মনে করেন এর জন্য শুধু মাত্র "প্রযুক্তি" ভূমিকা রেখেছে? আমার মনে হয় প্রযুক্তি এর থেকে বেশী ভূমিকা রেখেছে সেই সমস্ত মানুষ যারা এইরকম একটি উচ্চ প্রযুক্তিকে কিভাবে সাধারণ মানুষের সাধ্যসীমানায় নিয়ে আনা যায় এবং এটি দিয়ে business opportunity তৈরী করে নেয়া যায়, সেই সমস্ত মানুষদের কল্যানে। কে টের পেল যে বাঙালীরা এত কথা বলতে ভালবাসে?

 

আসলে আমাদের চারদিকেই এমন অনেক প্রযুক্তিই আছে যেগুলিকে মোবাইলের মতই ভাল ভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করে এর থেকে সুফল বয়ে নিয়ে আসা যায়। আমি ব্যক্তিগত ভাবে সব সময়ই গুরুত্ব দিই প্রযুক্তিকে business opportunity তে রুপান্তর করার জন্য। যেখানে অনেকেই এর জন্য সরকারকে দায়ী করেন। ব্রিটিশ আমলের ধ্যান ধারণা নিয়ে আমরা এখনও বসে আছি যে সরকার হল বাহির থেকে আসা অন্য কেউ। আসলে সরকার তো আমরাই। আমি মনে করি আমাদেরকেই প্রথমে খুঁজে বের করতে হবে কোনগুলিতে বেশি সুযোগ রয়েছে।

 

আমি কাজ করি ইলেকট্রনিক্স নিয়ে। জটিল কোন কথা বলব না, খুব সাধারণ একটি উদারহণ দিচ্চি। আপনি জানেন কি বিশ্বে সবথেকে কোন পদার্থ নিয়ে সবথেকে গবেষনা করা হয়েছে? কি আপনার গিন্নীর সোনার গয়না এর কথা ভেবে ভাবছেন তা বুঝি সোনা, নাকি ডায়মন্ড। সেগুলি নিয়েও বিজ্ঞানীরা অনেক কাজ করেছেন তবে সবথেকে বেশী কাজ হয়েছে সিলিকন নিয়ে। আপনি যে মোবাইলে কথা বলছেন, যে টিভি দেখছেন এসবই প্রতিবছর ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রাকৃতি হচ্ছে, কেননা সিলিকন দিয়ে খুব ছোট ছোট সার্টিক তৈরী করা যায় বলে। সিলিকন নিয়ে এত কাজ কেন হয়েছে জানেন? কেননা এতে ব্যবসায়ীরা সবথেকে বেশী অর্থ লগ্নী করেছে। ১৯৬০ এর পর থেকে সিলিকনের এমন কোন ধর্ম নেই যেটি নিয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষনা করেনি। অন্যান্য পদার্থের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের তেমন আগ্রহ নেই তাই অর্থ নেই, তাই আগ্রহ নেই। ব্যাপারটি হলে সেইরকম, আমরা যদি কোন কিছু থেকে business opportunity তৈরী করতে পারি তবেই সবাই আগ্রহী হয়ে উঠবে।

 

বিজ্ঞানের জগত থেকে একটু ফিরে দেখা যাক আমাদের দেশের দিকে। সেখানেও দেখবেন আমাদের পোষাক শিল্পকে লাভবান শিল্প হিসাবে পরিগনিত করা হচ্ছে, এবং এটি ভাল একটি business opportunity তাই সবাই তাতে আগ্রহী, টাকা খাটাতে দ্বীধা করেনা। সেইরকম আমাদেরকে অন্যান্য প্রযুক্তিগুলিকে ব্যবসাতে রূপান্তর করার চেষ্টা করতে হবে। যারা নিজ নিজ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন তাদের প্রযুক্তিগুলি শুধু মাত্র নিজেরা প্রযুক্তিবীদদের মধ্যে সীমাবন্ধ না রেখে আলোচনা করুন আপনার ব্যবসায়ী পারদর্শী বন্ধুর সাথে, দেখবান অনেক কিছুই এর মধ্যে বের হয়ে আসছে।

 

আসলে আমরা যারা প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করি তারা অনেক সময় খুব বেশী পরিমানে টেকনিক্যাল বিষয়গুলিতে ফোকাস করে ফেলি যার ফলে big picture টা দেখতে ব্যার্থ হয়। ঠিক একই কথা বলছিলেন ড. আতাউল করিম। (তাঁর সাক্ষাতকারটি http://biggani.com/content/view/375/125/ শুনতে পাবেন)। ড. করিম বলছিলেন, "গবেষক বা বিজ্ঞানীরা অনেক সময়ই এই বড় ছবিটি দেখতে ভুলে যান"

 

আমি মানছি আমরা উন্নত দেশের তুলনায় প্রযুক্তিতে পিছিয়ে রয়েছি। তবে তারা যেসব ক্ষেত্রে ধাক্কা খেয়ে শিখেছে বা শিখছে, আমরা সেখান থেকেই শিক্ষা নিতে পারি। একই রকম ভুল যেন আমারা না করি তা অন্তত তাদের কাছে শিখতে পারি। তবে এটি ঠিক যে সব প্রযুক্তিই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সুফল বয়ে আনবে তার কোন মানে নেই। যে কথাটি বলছিলেন আমার এক সহকর্মী, ড. বদরুল খান। আমরা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ই-শিক্ষা (e-learning) কে কিভাবে ব্যাবহার করা যায় তা নিয়ে কাজ করছি। ড. খান বলছিলেন, "বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রক্ষাপটে প্রযুক্তিকে আমাদের ব্যবহার করতে হবে"। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে কোনটি ভাল কাজে দিবে তা আমাদেরকেই খুঁজে বের করতে হবে। বাহিরের কেউ এসে আমাদের শিখিয়ে দিবে না। আর সেটি কামনা যদি আমরা করি তবে দেখবো আমাদের থলে থেকে মোটা অংকের টাকাও তাঁরা নিয়ে যাবেন, যেটি মোবাইল শিল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

 

আমাদের সামনে বড় তীব্র একটি সমস্যা হল বিদ্যুত ঘাটতি। একই সমস্যা হয়তো উন্নত বিশ্বে নেই, কিন্তু তারাও বিকল্প বিদ্যুত উৎসের সন্ধানে মরিয়া হয়ে আছে। আমরা অন্যান্য দেশের মত বড় অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞানীদের কাজে লাগাতে পারবনা, তবে উন্নত বিশ্বের বিজ্ঞানী গবেষনা করে যেটি শিখছেন তা আমরা শিখতে পারব। মজার ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীদের লব্ধ এই জ্ঞানগুলি উন্মুক্ত। পৃথিবীতে এমন কোন নিয়ম নেই যে উন্নত বিশ্বের গবেষনা বা লব্ধ জ্ঞানগুলি আমরা জানতে পারবনা। আমরা এই সমস্ত লব্ধ জ্ঞানগুলিকে আমাদের প্রয়োজনে লাগাতে পারি।

 

আর এই সমস্ত লব্ধ জ্ঞানগুলি বিজ্ঞানীরা প্রচার করবার জন্য বেশী মরিয়া। আপনি যদি কোন বিজ্ঞানীর গবেষনাপত্রগুলি পাবার জন্য তাকে ইমেইল করে লিখেন তবে আমি ব্যাক্তিগতভাবে দেখেছি সাধারণত ৮০% বিজ্ঞানীই আপনাকে তার পেপারগুলি পাঠিয়ে দেন। অর্থাৎ চিন্তা করে দেখুন আমারা উন্নত বিশ্বের লব্ধ জ্ঞানগুলি বিনা পয়সায় কাজে লাগাতে পারি।

 

কি ভাবছেন তথ্যপ্রযুক্তিতে আমরা পিছিয়ে? আমি বলব এর জন্য সমস্যা হল আমরা আমাদের রিসোর্সগুলিকে ঠিক মত কাজে লাগাতে পারছিনা। তথ্যপ্রযুক্তিতে এখন অপেনসোর্স খুবই প্রচলিত। কম্পিউটারের অনেক সফটই আপনি বিনা পয়সায় পাবেন। আমি এই কলামটি লিখছি সম্পূর্ণ অপেনসোর্স প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে। অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করছি উবুন্তু, এডিটর হিসাবে ব্যবহার করছি অপেন অফিস এবং বাংলা টাইপ করছি লিনাক্সের উবুন্তু বাংলা দিয়ে- এইগুলি সবই উন্মুক্ত। আসলে প্রযুক্তি কোন সমস্যা নয়। সমস্যা হল আমাদের সদিচ্ছার অভাব। আমি একটু সময় করে সদিচ্ছায়, যেভাবে এই প্রযুক্তিগুলিকে কাজে লাগিয়ে আপনাদের থেকে হাজার হাজার মাইল দুরের কোন এক গবেষনাগারে বসে লিখছি। কাল সকালেই এই লেখাটি চলে যাবে সম্পাদকের হাতে ইমেইলে। এক সপ্তাহের মধ্যেই আপনারা পড়বেন আমার এই লিখাটি। এটি সম্ভব করবার জন্য আমাদের রকেট বিজ্ঞান জানার প্রয়োজন নেই। আমাদের হাতের নাগালের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করলেই তা সম্ভব।

 

তাই পরিশেষে বলছি, প্রযুক্তি কোন সমস্যা নয়, সমস্যা হল এইগুলিকে কাজে লাগানোর সদিচ্ছার অভাব। এখন প্রশ্ন হল এই কাজটি কে করবে? ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ মানুষেরা? আমার মনে হয় এটি করতে হবে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন তেমন ব্যক্তিদেরকেই। উদ্দ্যোগ নিতে হবে বিজ্ঞানী, গবেষক, ইঞ্জিনিয়ারদেরকেই। আসুন আমারা খুঁজে বের করি কোন প্রযুক্তিগুলিকে আমরা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করতে পারি।

 

ওয়েস্টভার্জিনিয়া, আমেরিকা

৩০ আগষ্ট ২০০৭


pdf  PDF ফাইলে প্রবন্ধটি পড়ুন (৭ সেপ্টেম্বর ২০০৭ এ যায় যায় দিন্এ প্রকাশিত)

 

 

মন্তব্যগুলো (2)Add Comment
...
লিখেছেন ashraf, November 14, 2007
Excellent.
প্রযুক্তির সুপ্রয়োগ
লিখেছেন মনোজকুমার দ. গিরিশ--ManojKuamr D Girish, November 16, 2007

ডঃ মশিউর রহমান যে দিকটিতে সব চেয়ে বেশি আলো ফেলেছেন, সেটি হল বাঙালির ব্যবসায়িক মনোভাবের অভাবের দিকটি৤ বাঙালি অনুদ্যোগী নয়, তবে ব্যবসায়িক মনোভাব থেকে বহু দূরে তারা অবস্থান করে৤ একটি জাতির আর্থিক বনিয়াদ নির্ভর করে তার বাণিজ্য ভিত্তির উপর, চাকুরি করে কোনও জাতি ধনবান হতে পারে না৤ তাই জাতির দারিদ্র্য মোচন করতে হলে জাতিকে বণিক-জাতি হতে হবে৤ ডঃ রহমানকে ধন্যবাদ তিনি সঠিক দিকটিতেই আলোকপাত করেছেন৤ বণিকেরা ধূলি থেকে সোনা বানায়, সিলিকনও তো ধুলোই!
মনোজকুমার দ. গিরিশ কোলকাতা ১৬/১১/২০০৭

মন্তব্য লিখুন

security code
Write the displayed characters


busy
সর্বশেষ আপডেট ( Wednesday, 14 November 2007 )
 
< পূর্বে   পরে >

Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-Noncommercial-No Derivative Works 2.5 License.
Keyword: Bangladesh, Bangla, Bengali, science, technology, nanotechnology, technical, IT, computer, internet, solution, learning, asia, biggan, biggani, scientist, physics, chemistry, content, PHP, program, learn, c language, how, kivhabe, computer tips, amra, sobai, mile, desher, deser, unnoti, korbo, korte, chai, ekushe, ekush, dhaka, khobor, mojar, forum, adda, support, asun, sikhi, siki, sikkha, sikka, projukti, prokashoni, prokash, tothyoprojukti, notun