
[প্রথমপ্রকাশ : ঈদসংখ্যা, সাপ্তাহিক একাত্তর]
এক
পেছনে মেয়েলী একটা কন্ঠ শুনে হাঁটা ব›ধ করল মার্টিন, ঘুরে তাকাতেই দেখল এক ষোড়সী তরুণী ওরই দিকে এগিয়ে আসছে। মেয়েটি কাছে আসতেই তাকে চিনতে পারল ও। এই মাত্র যে রেস্তোরাঁ থেকে লাঞ্চ সেরে এসেছে সেই রেস্তোরাঁর বারকিপের দায়িত্ব পালন করতে দেখেছে ও এই মেয়েটিকে।
‘দুঃখিত ম্যাম...’ হ্যাটের ব্রীম স্পর্শ করে নড করল মার্টিন,‘আমি কি লাঞ্চের বিলটা পরিশোধ করেই এসেছিলাম?’
‘অবশ্যই! কিন্তু আমি তোমাকে সেজন্যে ডাকিনি...’ মিষ্টি কন্ঠে কথাটা বলল মেয়েটি। ক›ঠ যেমন মিষ্টি তেমন মিষ্টি চেহারাটাও। মায়া মায়া মুখটিই বলে দেয় এই মেয়ের দিকে দ্বিতীয়বার চোখ ফেরাতে বাধ্য হবে যে কেউ।
‘তুমি মনে হয় ভুল করে এই জিনিসটা ফেলে এসেছিলে-’ বলে হাতে ধরা কাগজের টুকরোটি বাড়িয়ে দিল সে।
টনক নড়ল মার্টিনের।
কাগজের টুকরোটা হাতে নিয়ে ওতে নজর বোলাতেই বুঝতে পারল ঝামেলা হবে। কিন্তু মেয়েটির হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে তাকাতেই ভুল ভাঙ্গলো ওর। সূর্যের আলোয় চিক্চিক্ করছে তার মখমলের কালো পোশাক।
‘ভয় পেও না...মি: স্টেঞ্চার, কারো ব্যক্তিগত সম্পদে হস্তপে করা পছন্দ করি না আমি। তাই ফিরিয়ে দিতে এলাম।’ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হাসিটাই যেন মার্টিনকে উপহার দিল মেয়েটি।
মনে মনে হাঁফ ছাড়ল মার্টিন।
বারটেবিলে মেয়েটির দৃষ্টি আকর্ষন করে এই চিরকুটটা ফেলে এসেছিল ও। স্রেফ মজা করার জন্য। প্রত্যত্তুরে একটুকরো বিরক্তির নিঃশ্বাসই আশা করেছিলো মেয়েটির কাছ থেকে। এখন যখন সামান্য এই কাগজের টুকরোটা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সামনে এসে দাঁড়াল মেয়েটি ভেবেছিল নির্ঘাত গোন্ডগোল বাধাবে এ। কিন্তু এখন ভাবছে মেয়েটি এই কাগজের টুকরোর রেশ ধরে যেছে পড়ে কথা বলার চেষ্ঠা করছে কেন ওর সাথে?
‘ধন্যবাদ ম্যাম!’ মৃদু হাসল মার্টিন,‘কিন্তু আমি কি জানতে পারি তুমি এই কাগজের টুকরোটাকে এত গুরুত্ব দিলে কেন?’
‘দুঃখিত, মিষ্টার...’
‘মার্টিন, মার্টিন ল্যাসলোর।’
‘হ্যাঁ, মিষ্টার মার্টিন, তোমাকে এই শহরে আগে কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না। সম্ভবত: এখানে এই প্রথমই এসেছো এবং এখানকার পরিবেশ সম্মন্ধে তোমার কোন ধারণাই নেই। যদি তাই হয় তাহলে আমি আশা করব এই মুহূর্ত থেকে তুমি নিজেকে গুছিয়ে রাখার চেষ্ঠা করবে।’
এখন ব্যাপারটা পুরোপুরি পরিস্কার হল মার্টিনের কাছে। আসলে মেয়েটি ওকে অত্যন্ত চাতুরীর সঙ্গে শাসানোর জন্য এসেছে। রেগে গেলে এ নিশ্চয়ই এভাবেই মনের জাল মেটায়? অথচ এতন মেয়েটির এ আচরনকে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রশ্রয় ভেবে ভুল করছিল ও।
দ্রুত নিজেকে গুটিয়ে নিল মার্টিন।
‘অবশ্যই ম্যাম,তোমার উপদেশ আমার মনে থাকবে...’ বলল সে।
‘শুনে খুশি হলাম।’ বলে ঘুরে দাঁড়াল মেয়েটি। নিতম্বে ঝড় তুলে বারের দিকে হাঁটা ধরল।
‘তুমি নিজে যেমন সুন্দর তেমনি তোমার কথাবার্তাও খুব সুন্দর ম্যাম। তোমার সাথে অবশ্যই আমার আবার দেখা হচ্ছে...’ পিছন থেকে মেয়েটিকে যেন বিদায় জানালো মার্টিন। হাতের কাগজটাকে ছিঁড়ে কুটিকুিট করে বাতাসে উড়িয়ে দিল ও।
বিশেষ কিছু কাগজটায় লিখেনি ও।
কেবল একটা লাইনই লিখেছিলো:‘তোমার তুলনা তুমি নিজেই ম্যাম।’
যাক্! মজাটা মজার ল্যাটাতেই চুকে গেল! মেয়েটা বুদ্ধিমান, চাইলেই ওকে ধোলাই খাওয়াতে পারত। হয়ত নিজের ব্যক্তিত্ব জারি করার সুযোগটা হাতছাড়া করতে চায়নি। তাই ঝামেলা টেনে আনেনি। তবে মার্টিনের বুঝতে বাকি নেই যে এই মেযেটির সামান্য একটা ইশারাই শহরের তাবৎ ছেলেপেলের আগমনে ওর ভবলীলা সাঙ্গ হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ ছিল।
‘তোমার নামটাই জানা হলো না ম্যাম!’ বারের দরজা টেলে ভেতরে মেয়েটিকে প্রবেশ করতে দেখে নিজের পথ ধরল মার্টিন। হাঁটার মধ্যেই একটা সিগারেট রোল করে ঠোঁটে ধরাল। শহরের ধূলোমলিন ফুটপাত ধরে হাঁটছে ও। নাকে এসে ঝাপ্টা মারছে উৎকট গন্ধ। সেইসাথে চোখ মুখে এসে পড়ছে ধূলোবালি।
ব্যানডানা তুলল ও নাক বরাবর। রাস্তার দুু’পাশটা দেখতে দেখতে এগোচ্ছে ও। সারিবদ্বভাবে দুপাশেই বড়ছোট প্রচুর দালানকোঠা দাঁড়িয়ে আছে। লিভারী ষ্টেবল,জেনারেল ষ্টোর, সেলুন, বার,ক্যাফে হাইসম, ল-অফিস,গির্জা...সবই আছে। কিন্তু এইমুহুর্তে মার্টিনের কল্পনায় পরিস্কার একটা হোটেলের পরিচ্ছন্ন কামরার ছবি ভাসছে। গত ছত্রিশঘন্টা একটানা দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে এই গ্রীনটাউনকে আবিস্কার করেছিল ও। নিজের প্রিয় কালো স্টালিয়নটাকে তো প্রথমেই আস্তাবলের হসল্যারের হাতে সপে দিয়ে এসেছিল ঘন্টা দেড়েক আগেই। এখন ওর নিজেরও একটু বিশ্রাম নেয়া দরকার। প্রথমে গোসল এবং ঘন্টা তিনেকের সীমিত অথচ শরীর মন ফুরফুর করার জন্য যথেষ্ট পরিমান ঘুম প্রয়োজন।
একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে সিগারেটটা আঙুলের ফাঁকে নিয়ে এদিক-ওদিক দৃষ্ঠি ফেলল মার্টিন। ওর দৃষ্টি খুঁজছে একটি ভাল হোটেলের সাইনবোর্ড।
হাঁটতে হাঁটতে চৌরাস্তায় চলে এল ও। ডানে বাক নিয়ে এগোল খানিকটা, নজরে পড়ল বড়সর একটা দালান। কাঠের রঙ ফালি ফালি হয়ে চটে গেছে বিধায় আত্মপ্রকাশ ঘটেছে র্যাদা করা কাঠের। তবে ব্যাটউইং দরজার উপরে জাকঝমকপূর্ণভাবে লেখা ‘স্যালিম্যান হোটেল এন্ড সেলুন’ কথাটি উৎসাহী লোকেদের স্বাগতম জানাতে আকর্ষনীয় ভূমিকা পালন করছে।
হাতের সিগারেটটা মাটিতে ফেলে বুট দিয়ে পিষে হোটেলের দরজার দিকে এগোল মার্টিন। রাস্তার ওপাশে প্রচুর লোকজন চলাচল করছে ফুটপাথ ধরে। সবাই যার যার ধান্ধায় ব্যস্ত। আগত নতুন আগন্তুকের প্রতি কারোরই নেই আগ্রহ। কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না ওর দিকে। মার্টিন জানে নতুন মুখের আর্বিভাব এখানে বিচিত্র কিছু নয়।
হোটেলের দরজার সামনে উপযুক্ত আকৃতির বারান্দা ও সিড়ি অ্যাডজাষ্ট করা। ওখানে আসতে না আসতেই ভেতর থেকে ছিটকে বেড়িয়ে এল এক লোক। অপ্রস্তু^ত অবস্থায় বেরিয়ে আসায় তাল হারিয়ে গিড়ে যাচ্ছিল, মার্টিনের সাথে ধাক্কা খেল। মাথা থেকে হ্যাট পড়ে গেল তার । একটু সরে দাঁড়িয়ে লোকটাকে সামলানোর সুযোগ দিল মার্টিন। লোকটাও নিজেকে সামলে নিল ঠিকই কিন্তু অনেক বেশি গিলে ফেরায় মাতলামীর মাত্রাটাকে নিয়ন্ত্রনে আনতে পারছে না। তার হ্যাটটা ঝুঁকে মাটি থেকে তুলে হাতে ধরিয়ে দিল মার্টিন। লোকটার বিধ্বস্ত চেহারা দেখেই বুঝতে পারছে ভেতর থেকে মাল খেয়ে এসছে এ।
‘নিজেকে সামলাও খরগোশ কোথাকার!’ চাপা বিরক্তির সাথে মাথা ঝাকাল ও।
‘যাচ্ছেল!’ খ্যাপা কন্ঠে বলল মাতাল,‘তুমি যেতে পার ব›ধু!’ তারপর মাতালের তাচ্ছ্বিল্য বলতে যা বুঝায় সেরকম মন্তব্য করেই কথাটা বলল। এবং উল্টো ঘুরে হাঁটা ধরল। যেন কিছুই ঘটেনি।
হোটেলের ভেতর ঢুকল মার্টিন।
লম্বা কাউন্টার। পেছনের দেয়ালে থরে থরে সাজানো চাবির জোটা একটা সেলফের ভিতর তালা দিয়ে আটকানো।
খদ্দেরের আগমন ল্য করে এগিয়ে এল বারটেন্ডার। হ্যাংলা শুকনো ও পাতলা গড়নের শরীর। কালো চামরা আর মুখে বসন্তের দাগ লোকটার। নিগ্রো।
‘হাউডি মিষ্টার। গ্রীনটাউনের একমাত্র হোটেল স্যালিম্যান-এ স্বাগতম’ নির্মল অথচ খসখসে কন্ঠে মার্টিনকে অভ্যর্থনা জানাল বারটেন্ডার।
‘ধন্যবাদ, আমার একটা কেবিন প্রয়োজন।’ সেলুনের দিকে তাকিয়ে জানাল মার্টিন। জনা দশেক খদ্দের ছড়িয়ে ছিটিয়ে যার যার টেবিল দখল করে তাস,হুইকি অথবা ফালতু গল্প গুজবে মত্ত হয়ে আছে। কেউই ওর দিকে তাকালো না।
‘একটাই মাত্র কেবিন খালি আছে স্যাহ।’ মার্টিনের একহারা সুঠাম সুদর্শন দেহায়বয়বের ওপর নজর বুলিয়ে যন্তুষ্ট চিত্তে বলল বারটেন্ডার। ঘুরে পেছনের কী-বোর্ড খেলার জন্য এগাল সে।
‘এখন আশা করব গোসলের যাবতীয় ব্যবস্থাই করে রাখা আছে?’
‘অবশ্যই স্যাহ্।’
কী-বোর্ড থেকে একটা চাবি নিয়ে এসে মার্টিনের হাতে দিল নিগ্রো। হাসিমুখে জানিয়ে দিল রুমের লোকেশন-‘ডানের সিঁড়ি দিয়ে দো-তলায় উঠে সোজা চৌদ্দ নম্বার কেবিন।’
চাবি হাতে নিয়ে রুমের ভাড়া মিটিয়ে দিল মার্টিন। জানিয়ে দিল সন্ধ্যা না শেষ হওয়া পর্যন্ত বিশ্রাম নেবে ও। তারপর সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ওকে মালপত্রহীন দেখে একটু আবাকই হল বারটেন্ডার। ‘মিষ্টার মার্টিন-’ খাতায় পরিচয় রেজিষ্ট্রি করার সময় মার্টিনের নাম জানা হয়ে গেছে নিগারের,‘মনে হচ্ছে তুমি খালি গায়েই ,এসেছো?’
‘তুমি ঠিকই ধরেছো স্যালিম্যান,’ ঘাড়ের ওপর দিয়ে মুখ ফিরিয়ে হাসল মার্টিন। এই নিগ্রো কংকালই যে স্যালিম্যান জানা হয়ে গেছে ওরও।
কিছু কেনাকাটা করতে হবে।
‘সন্ধ্যা পরেই তোমার সাথে কথা হবে স্যালিম্যান।’ কোমরের দু পাশের দুই সিক্সগানের দিকে তাকিয়ে হাসল স্যালিম্যান। ও জানে ওগুলো বেশিন আর ওখানে থাকবে না।
দুই
স›ধ্যা শেষে হোটেলের সেলুনটাতেই এসে বসল মার্টিন। প্রচুর লোকের সমাগম ঘটেছে এখন স্যালিম্যানের বারে, সবার ওপর নজর ঘুরিয়ে আনল ও। কাউন্টারে স্যালিম্যানকে ব্যস্তভাবে ফরমাইশ খাটতে দেখল। লেবার ছেলেটাকে ডেকে হুইস্কির অর্ডার দিল মার্টিন। হাতের কাছে একটা পুরনো খবরের কাগজ দেখে ওটাতেই ডুব দিল। শরীর মন দুটোই এখন ওর ফুরফুরে আর সতেজ হয়ে আছে। বিকেলটা একঘুমে পার করার ইচ্ছে থাকলেও ঘুম না আসায় সেটা হয়ে ওঠেনি । তবে বিছানার কাছে বেশ কিছু কই বই ছিল বলে ওগুলো ঘেটেগুটেই সময়টা কাটিয়েছে ও।
হঠাৎ মার্র্র্টিনের খেয়াল হল কিছু কেনাকাটা করতে হবে ওকে। সেইসাথে রাতের সাপারটির সেই ঝন্ঝনে তরুনীর রেস্তোরাঁয় গিয়ে সারবে বলে ঠিক করেছে। মেয়েটি যথেষ্ঠ দেখিয়েছে ওকে। মনে হচ্ছে মেয়েটার সাথে জমবে ভাল। মেয়েটির শীতল আকর্ষনীয় চাহুনী আর মনোমুগ্ধকর হাসি মার্টিন কিছুতেই ভুলতে পারছে না। ও জীবনে কোনদিন কোন মেয়েকে নিয়ে এভাবে ভাবেনি। যদিও মার্টিন জানে যে ওর অনিশ্চিত জীবনের সাথে কোন মেয়েকে জড়ানো চলবে না। তবে হাঁ- নিজের একটা অবস্থান যদি কোথাও মোটামুটি স্থায়ী করা যায় তাহলে হয়ত একজনকে না একজনকে জড়াতেই হবে।
আপাতত মেয়েটার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল মার্টিন। গ্লাসের শেষ হুইস্কিটুকু গলায় ঢেলে উঠে দাঁড়াল। শহরের মতিগতি সম্মন্ধে এটা সেটা জানার বড় ইচ্ছে ছিল স্যালিম্যানের কাছ থেকে, কিন্তুু তাকে খদ্দেরের ভীড়ে ঘটনোর চিন্তা বাধ দিয়ে লেবারের কাছে থেকে বিলটা চুকিয়ে দিল ও। তাকে জানিয়ে দিল সাপারটা বাইরেই সারবে। তারপর হোটেল থেকে বেরিয়ে এল।
গ্রীনটাউনকে ক্যাটল টাউন বললে ভুল হবে না। উত্তরের ট্রেইল ধরে মার্টিন যখন এই শহরে এসে ঢুকে তখন আসার সময়ই দেখেছে ত’নভূমীর এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রচুর র্যাঞ্জ হাউস। একেকটা করালে কম করে হলেও সাত-আটশো গরু মজুত আছে। অবশ্য কিছু কিছু র্যান্স আছে যা নিতান্তই ছোট, শ’তিনেকের বেশি গরু ট্র্র্র্যাকেল করা ওসব জায়েগায় সম্ভব নয়।
মার্টিন প্রথমে আস্তাবলে গিয়ে ওর ষ্ট্যলিয়নটার প্রতি পরিচর্যার ধরন দেখে এল। খুশি হয়ে আসার সময় হসল্যার ছেলেটাকে কিছু বখশিশ দিল। বিনিময়ে অবশ্য ছেলেটিও ওকে জানিয়ে দিল বেশকিছু টাটকা খবর। ইদানীং নাকি এদিকটায় অবাঞ্ছিত যত আগন্তুকের আবির্ভাব ঘটেছে। খুনাখুনি না হলেও গ্রীনটাউনে গুলাগোলি প্রায়ই হচ্ছে। আইনের কোন বালাইই নেই শহরে। এই তো, ক’দিন আগেও ব্যাংক ডাকাতি হল। জ্যারির র্যাঞ্চ থেকে চুরি হল পাক্কা আশিটা গরু। আরো কত কি!
দরজির দোকানে এসে পছন্দসই বেশকিছু পোশাক আর একজোড়া বুটের অর্ডার সাবমিট করল মার্টিন। যাবার পথে জিনিসগুলো নিয়ে যাবে ও।
চর্বির ডিপো অথচ হুবুহু শিম্পাঞ্জীর মত দেখতে দর্জি লোকটা ওকে জিজ্ঞেস করেছিল যে সে এখানে ব্যবসা করতে নাকি কাজের ধান্ধায় এসেছে। উত্তরে মর্টিন শুধু লোকটার পারিশ্রমিক টেবিলে রেখে বেরিয়ে এল। পেছন থেকে লোকটার সাবধানবানী কানে এল ওর, ‘নিজেকে গুটিয়ে রেখো স্ট্রেঞ্জার। শহরে এমন কিছু লোক আছে যারা কারণ বা অজুহাতের ধারও ধারে না।’
একটা জেনারেল স্টোরে ঢোকার ইচ্ছে ছিল মার্টিনের। কিন্তু তার হাঁটাহাঁটি করতে মন সায় দিল না, ফলে রওনা হল ও রেস্তোঁরার দিকে। কি জানি কেন ওর মনে হচ্ছে ঐই ঠান্ডা প্রকৃতির মেয়েটি যেন ওকে ডাকছে! দ্রুত পা হাঁকাল মার্টিন। ‘জে এন্ড জেনি রেস্তোরাঁ’ নামটা থেকে আন্দাজ করছে মেয়েটির নামই সম্ভবত জেনি।
রেস্তোরাঁয় ঢুকেই মার্টিনের আশা ছিল জেনির মুখটা নজরে আসবে। কিন্তু তার জায়াগায় বারকীপিংয়ে দেখা গেল ষোল-সতেরো বছর বয়সী এক তরুনকে। যথেষ্ট মিল আছে জেনির সাথে এই ছেলের, চেহারার মিল।
‘ইভনিং স্ট্রেঞ্জার! জ্যানের ডাগআউটে স্বাগতম!!’ ছেলেটার ক›ন্ঠস^র শুনে মার্টিন নিñিত হল এ অবশ্যই জেনির ভাই না হয়েই যায় না। কিন্তু ছেলেটার আশেপাশে জেনিকে দেখতে পেল না ও।
‘ধন্যবাদ জ্যান, সাপারের ঝামেলা মিটাতে এলাম।’ ীন হেসে বলল মার্টিন। টেবিলের ওপর তিনটে ডলার রাখল। মেন্যুটা জানিয়ে দিল। ‘পেটপুরে খেতে চাই আমি।’
‘নিঃসন্দেহে মিষ্টার...’
‘মার্টিন, মার্টিন ল্যামলোর।’
‘হ্যাঁ মিষ্টার মার্টিন, তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে না তুমি অন্যদের মত টাউট আগন্তুক?’ নিস্পৃহ ক›েঠ বলল জ্যান, ‘সে হিসেবে একটা প্রশ্ন করতে পারি?’
‘নিশ্চয়ই করতে পারো,’ মার্টিন একটা সুযোগ খুঁজছে, কোনভাবে যদি জ্যানকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেয়া যায় জেনি কোথায় তাহলে ওর অশান্ত মনে কিছুটা স্বস্তি আসত।
‘তুমি কি এ শহরে থাকবে কিছুদিন?’
‘সেটা নির্ভর করছে সময়ের ওপর। সেইসাথে আমার কোমরে ঝোলান পিস্তল দু’টোও আমকে স্বীদ্ধান্ত নিতে সহযোগীতা করবে।’
‘তবে তোমার পকেটের অবস্থা অনুমান করে বুঝতে পারছি তুমি কাজের ধান্ধায় আসনি।’
বুদ্ধিমান ছেলে, ভাবল মার্টিন।
‘তুমি ঠিক ধরেছো। আর পকেটের একটা ব্যবস্থা করতে আমাকে ব্যাংকের ধারস্ত হতে হবে। যদিও শুনেছি ক’দিন আগে নাকি ব্যাংক লুট হয়েছে...’
‘সে েেত্র অন্য ব্যাংকে টুঁ মারতে পার তুমি।’
মার্টিন বুঝতে পারল ছেলেটাকে কৌশলে হোক আর যেভাবেই হোক, জেনির কথা জানতে চাইলেই ধারা পড়ে যাবে। ছেলেটো ওকে খাঁটি ভদ্রলোক বলেই ধরে নিয়েছে।
‘মেয়েটার চিন্তা বাদ দাও খোরগোশ কাহিকে!’ নিজের মুদ্রাদোষটাই মার্টিনকে ঝেড়ে ধমক লাগল। টেবিলের পাশে সরে এল ও। খাবারের প্লেটগুলো আসতেই গ্রোগ্রাসে গিলল। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতেই চলে এল কফির মগ। ওতে চুমুক দিতে দিতেই নেহাত অভ্যাস বশে এবং পূনরায় জেনির চিন্তা মাথায় আসায় চারপাশে অনুসন্ধানী দৃষ্টি চালাল। ভাবছে মেয়েটা গেল কোথায়? ওদের কি কোন র্যাঞ্চ হাউস আছে নাকি? থাকারই কথা, হয়ত এখানকার ডিউটি শেষ তাই ফিরে গেছে ঘরে।
হঠাৎ দরজা খোলা ও বন্ধের ‘দড়াম!’ শব্দটা মার্টিনের চিন্তাধারায় ব্যাঘাত ঘটাল। তাকিয়ে দেখল চারজনের একটি বাখোয়াজ কিশোরের দল এসে ঢুকেছে রেস্তোরাঁয়। পরনে ফানেলের শার্ট আর সুইস প্যান্ট। মাথার হ্যাটগুলো পিঠে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সন্দেহ নেই- ওরা প্রত্যেকেই ঝামেলাবাজ ছেলেপুলে।
পাত্তা না দিয়ে কফির মগে মনোযোগ দিচ্ছিল মার্টিন, কিন্তু ‘চটাশ!’ শব্দটা ওর কানে যেন বজ্রাঘাত করল। চেয়ে দেখল জ্যান গালে হাত দিয়ে কাঁপছে। রাগে না ভয়ে তা ওর চেহারা দেখে বোঝা গেল না। কাউন্টার টপকে ওর দু’পাশে দাঁড়িয়েছে দুই চ্যালা, এ পাশে দাঁড়ানো নেতা গোছের লম্বা ছেলেটা জ্যানের কলার খামছে ধরে ঝাঁকাচ্ছে। বোঝা গেল চড়টা এই মেরেছে।
‘আমার লোকের গায়ে হাত তোলার সাহস দেখিয়েছো তুমি জ্যান,’ গর্জে উঠল ছেলেটা। ‘সুতরাং এখন তো তোমাকে অল্প কিছু সহ্য করতেই হবে!’
‘তোমার লোক আমাদের গরু চুরি করেছিল।’ নিজের কালারটা ছাড়িয়ে বলল জ্যান। যে গালে চড় খেয়েছে সেখানটায় পাঁচ আঙুলের দাগটা মার্টিনের নজরে আসছে। ‘শুধু তাই নয়, আমার বোনের সাথে অশ্লীল ব্যবহার করেছে ল্যারি আর ক্যাট।’
‘জেনিকে তো আমারও কিছু বলতে ইচ্ছে করে। শুধু কি তাই, রাজি থাকলে বিছানায়...’
‘যথেষ্ঠ বলেছো ভিকি!’ এবার আক্রোশে ফেটে পড়ল জ্যান। আঙুল তুলে শাসাল, রেগে গেছে ভীষন। ‘আমার বোন সম্পর্কে আর বাজে কথা বলেছো তো-’
‘দুলাভাই বলে ডাকবে নাকি!’ খ্যাঁক খ্যাঁক করে বিকট শব্দে হেসে উঠল ভিকি নামের বদমাশটা। ওর দেখাদেখি অন্যরাও তাল মেলাল।
প্রচন্ড রাগে ভিকিকে ঘুষি মারতে যাচ্ছিল জ্যান, পাশের দু’জন ওকে ঝাপ্টে ধরল। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও পারল না জ্যান। ওর অন্য গালে কষে আরেকটা চড় বসাল ভিকি। আর্তনাদ করে উঠল জ্যান। ওর অসহায় অবস্থা দেখে খিল্খিলিয়ে হাসল সবগুলো শয়তান।
হঠাৎই রেস্তোরাঁর ভেতর যেন বাজ পড়ল!
প্রথমে গুলির এবং এক সেকেন্ডের ব্যবধানে কিছু একটা গুড়িয়ে যাওয়ার শব্দ কানে গেল সবগুলো টাউটের। কয়েক মূহূর্তের জন্য গোটা রেস্তোঁরা জুড়ে নেমে এল নিস্তব্ধতা।
‘ব্যাপার কি মিস্টার?’ মার্টিনের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল ভিকি। এতন যেন কেউই মার্টিন কে দেখেনি সেরকম দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল সবাই।
মার্টিন চেয়ারটা দেয়ালে ঠেকিয়ে তার দু’পা টেবিলে তুলে হাতে ধরা পিস্তলটাকে ঘোরাচ্ছে। ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি। পিস্তলের নল থেকে কুন্ডলী পাকিয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে ধোঁয়া।
‘আমার কফির মগটা তোমার অসহ্য কথাবর্তা সহ্য করতে না পেরে ঠিক তোমার খুপরি বরাবর রওনা হয়েছিল,’ শান্তস্বরে ব্যাখ্যা করল মার্টিন। ‘আমার পিস্তলের বুলেট ওটাকে চুরমার করে না দিলে ওটা তোমার খুলি চুরমার করে দিত ভিকি!’
ভিকি সামান্য নড়ে উঠতেই আবার শোনা গেল গুলির শব্দ। সবাই বিষ্ফারিত দৃষ্টিতে দেখল ভিকির কোমরে ঝোলানো পিস্তলটা মাটিতে পড়ে গেছে।
‘যেভাবে আছো সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবে বন্ধুরা।... আর তোমরা দু’জন, হ্যাঁ- জ্যানকে ছেড়ে দিলে খুশি হব।’ অত্যন্ত ধীরে ও শান্ত গলায় বলল মার্টিন। ‘জ্যান, ওদের কোমর থেকে জঞ্জালগুলো তুলে নাও। এবং আমার কাছে এনে জমা দাও।’
কাজে লাগল জ্যান। পিস্তলগুলো জমা করে এনে রাখল মার্টিনের সামনে। বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করার সাহস পেল না চার গুন্ডার কেউ। যে লোক বেকায়দা অবস্থায়ও দশ কদম দূরের হোলষ্টার থেকে পিস্তল খসাতে পারে সে অবশ্যই ফালতু কেউ নয়। সুতরাং তর্ক করার স্পর্ধা দেখাল না কেউ। তবে ভেঙচি কাটলো ভিকি। ‘তুমি আবার আমদের মধ্যে গুতোতে এলে কেন মিষ্টার?’ বিরক্ত কন্ঠে বলল সে।
‘কারন, অতিরিক্ত ঝামেলা আমি পছন্দ করি না,’ জবাব দিল মার্টিন। ‘কিন্তু আরো বাকি আছে, জ্যান,’ বলে জ্যানের দিকে তাকল। ‘তোমার দু’গালে মোট দশ আঙুলের ছাপ আছে, মিষ্টার ভিকির গালেও আমি তা দেখতে চাই!’
জ্যানের মুখে হাসি। ওর বুঝতে বাকি নেই যে মার্টিনের মত একজন ওর পাশে থাকতে কোন চিন্তা নেই। তাই ভিকির দিকে পা বাড়াল ও।
‘বেশি বাড়াবাড়ি করছো তুমি আগন্তুক!’ নিশপিশ করে উঠল ভিকি, জ্যানের দিকে কটমট করে তাকাল। তার অগ্নিদৃষ্টিকে উপো করে কাছে এল জ্যান। পরমুহুর্তে প্রচন্ড জোরে ‘চটাশ!’ শব্দটা প্রতিধ্বনি তুলতেই দেখা গেল হুমড়ি খেয়ে ফোরে পড়ে গেছে ভিকি।
‘ব্রেভো জ্যান ব্রেভো! কিন্তু আরেকটা যে বাকি রইল?’ পিস্তল ধরা হাত দিয়েই তালি বাজালো মার্টিন। যেন দৃশ্যটা দারুন উপভোগ করেছে ও।
ভিকিকে টেনে তুলতে এগোল জ্যান। কিন্তু ইশারায় তাকে বাধা দিয়ে টলমল করে উঠে দাঁড়াল ভিকি। ঠোঁট ফেটে রক্ত গড়াচ্ছে ওর। হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে রক্ত মুছল ও। অন্য তিন সঙ্গীরা বেকুবের মত দাঁড়িয়ে আছে স্তম্ভিত হয়ে। কারোরই মুখে কথা ফুটছে না।
‘তোমার সাহসের তারিফ না করে পারছি না স্ট্রেঞ্চার।’ গমগমে স্বরে বলল ভিকি। ‘তবে জেনে রেখো-সুযোগ আমারও আসবে।’
হাতের পিস্তলটা হোলষ্টারে পুরে সিগারেট রোল কথা শুরু করল মার্টিন। যেন কিছুই শুনছে না।
ভিকির দৃষ্টি গিয়ে পড়ল এবার জ্যানের উপর। ‘আর তুমি জ্যান, তোমার সাথে আমার অবশ্যই বোঝাপড়া হবে। তোমার বিষয়টা আপাতত স্টকে তুলে রাখলাম...’
‘আমাদের অস্ত্রগুলো ফেরত দাও।’ ভিকির এক চ্যালা চেঁচাল।
‘সম্ভবত জ্যানদের গরুগুলো তোমরা ফেরত দাওনি, ওদের গরুগুলো ফেরত দেয়ার সময় র্যাঞ্চের ফোরম্যান যেই হোক না কেন তার কাছ থেকে বুঝে নিও।’ নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল মার্টিন।
‘দেখ....’ কর্কশ কন্ঠ জারি করতে যাচ্ছিল ভিকি, বাধা পেল।
‘জ্যান, খোরগোশগুলোকে আমার চোখের সামনে থেকে সরে যেতে বল। নচেৎ আমার পিস্তলটা দ্বিতীয়বার খাপমুক্ত হলে স্রেফ রক্তের বন্যা বইয়ে দেবে।’
আর একটি কথাও বলার সাহস পেল না ছেলেগুলো। ঝট্ করে ঘুরে দাঁড়িয়ে রওনা হল সবাই। তবে বারবার ফিরে তাকাল। ভঙ্গিটা যেন এমন-‘ঠিক আছে, আমরাও দেখে নেব!’
‘বন্ধুরা, আবার এসো!’ পেছন থেকে চেঁিচয়ে ওদেরকে গুডবাই জানাল মার্টিন। তাকিয়ে দেখল জ্যান অবাক-বিস্ময়ে একদৃষ্ঠিতে তাকেই দেখছে। তুড়ি বাজিয়েও জ্যানের পলক নাড়াতে পারল না মার্টিন। জ্যান যেন একজন ‘ভদ্রলোক’কে নতুন করে আবিষ্কার করল। জ্যানের বিষয়টা চাপা পড়ল আচমকা দরজা খোলা শব্দে। মার্টিন দেখলো হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকেছে ওরই কল্পনার ঝড় জেনি! অসম্ভব উত্তেজিত দেখাচ্ছে ওকে। যেন ভয়ানক দুঃসংবাদ পেয়ে ছুটে এসেছে।
‘তুমি ঠিক আছো তো জ্যান!’ চিৎকার করে জ্যানের দিকে ছুটে এল জেনি। জড়িয়ে ধরল ভাইকে। ‘ফর গড শেক...!’ ফোঁপাল মেয়েটি।
তিন
হাতজোড়া বুকের ওপর বেঁধে পিলারের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শেরিফ। দীর্ঘ, সুঠামদেহী-কিন্তু সুদর্শন নয়। চেহারায় ব্যাক্তিত্বের ছিটেফোঁটাও নেই, তবে দৃষ্টিতে রয়েছে অসম্ভব আত্মপ্রত্যয়ী ভাব। শীতল অথচ চঞ্চল চোখজোড়াই বলে দেয় ভীষণ চতুর ও চালাক লোকটা। প্রয়োজনে পেছন থেকে আঘাত হানতেও দ্বিধা করবে না বিন্দুমাত্র।
সম্ভবত: শেরিফ এতন যার জন্য অপো করছিল তাকে দেখতে পেল। যতটুকু সম্ভব নিজের মধ্যে ব্যাক্তিত্ব জাহিরের ব্যর্থ চেষ্টা করল সে।
ধীর পদেেপ এগিয়ে আসছে জেনি।
নিজের চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছে ও। ভাবছে গতকাল রাতে মার্টিন নামের যে লোকটা তার ভাইকে শয়তান ভিকির হাত থেকে উদ্ধার করেছে তার কথা। বারবার মনের মধ্যে লোকটার পৌরষ্যদীপ্ত অথচ হাস্যোজ্জ্বল মুখটা ভেসে উঠছে। লোকটা কে? গ্রীনটাউনে আসার পেছনে কি তার কোন উদ্দেশ্য আছে?
এই শহরে সচরাচর ব্যবসা বা কাজের ধান্ধা ছাড়া কেউ তেমন একটা আসে না। যারা আসে তারা হয় রাসলার নচেৎ আউট-লদের কেউ। কিন্তু মার্টিনের মত মিশুক আর নরম স্বভাবের মানুষ কি সে রকম কেউ হতে পারে? অবশ্যই না।
‘দুঃখিত ম্যাম!’ জেনির চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটাল শেরিফ। তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।’ হ্যাট খুলে বাউ করল সে।
‘কি ব্যাপার শেরিফ, কখন ঘুম ভাঙলো তোমার!’ যেন ভীষন অবাক হয়েছে তেমন ভান করল জেনি।
মেয়েটার খোঁচা মেরে কথা বলার অভ্যাসটা আর গেল না! মনে মনে খিস্তি আওড়াল শেরিফ। তারপর মুখে হাসি ফুটিয়ে আসল প্রসঙ্গে এল।
‘ম্যাম, তোমার রেস্তোরাঁয় নাকি গতকাল গন্ডগোল বেধেছিল?’
‘স্বপ্নে বুঝি তাই দেখেছো?’ কন্ঠ নাচিয়ে বলল জেনি।
নিরবে অপমানটা গায়ে মাখল শেরিফ। বিব্রতবোধ করছে সে। যদিও সে জানে জেনির মুখের ওপর কথা বলা মানে চিরতরে চাকরীটা খোয়ানো।
নিজেকে সামলে নিল শেরিফ। বলল, ‘মার্টিন ল্যাসলোর সম্পর্কে তোমার সতর্ক হওয়া উচিত ম্যাম, তুমি হয়ত জানো না....’ বাধা দিল জেনি।
‘আমি ভাবছি তোমার জায়োগায় ঔই লোকটাকেই কিভাবে বসানো যায়।’
‘তা বসিয়ো ম্যাম, কিন্তু...’
‘ফালতু কথা বলে সময় নষ্ট করা আমার ধাতে সয়না শেরিফ। তুমি বলেছো, আমি শুনে নিয়েছি। এবার বিদায় হও।’ ঝাঝাঁলো কন্ঠে বলল জেনি। যদিও বুঝতে পারছে আপমানটা অতিরিক্তই হয়ে গেছে।
কিন্তু শেরিফ ওর আচরনে বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না। বরং জেনির কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপো করল। তারপর বলল, ‘ম্যাম, বোঝার চেষ্টা কর প্লীজ! মার্টিন এর ব্যাপারে তোমার সাথে দরকারী আলাপ করা প্রয়োজন।’
জবাব দিল না জেনি। কিছুন তীè দৃষ্টি নিয়ে শেরিফের দৃঢ়তা পর্যবেন করল।
ব্যাপার কি?
লোকটা মার্টিন সম্পর্কে এত উদ্ধিগ্ন কেন?
মার্টিন কি তবে কোন আইনভঙ্গকারী বাউন্ডুলে?
অবশ্য এমনও হতে পারে নিরপরাধ হয়েও আইনের চোখে অপরাধী। কারও সরল মুখশ্রী তো আর মনের ধান্ধা জানান দিতে জানে না! সুতরাং দেখাই যাক না শেরিফ কি বলে।
মাথা ঝাঁকাল জেনি। বলল, ‘ঠিক আছে- কি বলতে চাও ভনিতা না করে সরাসরি ঝট্পট বলে ফেলো।’
‘এখানে নয় ম্যাম, চল- আমার অফিসে গিয়ে বসা যাক।’
মুহুর্তনেক ইতস্তত করল জেনি। কিন্তু কিছু একটা ভেবে রাজি হয়ে গেল।
আন্তরিক হাসি দেখা গেল শেরিফের ঠোঁটে।
কাছেই তার অফিস। ইশারায় জেনিকে আগে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে পিছন পিছন সেও রওনা হল।
হোটেলের কেবিনের জানালা থেকে মার্টিন ল্য করল তার স্বপ্নের রানী জেনি একটা লোকের সাথে কথা বলছে। লোকটার আচরণ দেখে মনে হচ্ছে সে জেনিকে কিছু একটা বলার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। কিন্তু জেনি তাকে মোটেও পাত্তা দিচ্ছে না।
লোকটা কে?
জেনির কাছে কি চায়?
কেমন জানি চেনা চেনা লাগছে না লোকটাকে?
হাঁ,মনে পড়েছে- গতকাল স্যালিম্যানের হোটেল থেকে বেরিয়ে এসে মাতাল অবস্থায় মার্টিনের সাথে ধাক্কা খেয়েছিল এই লোকটাই। কিন্তু এই মাতাল জুয়াড়ীটা জেনির কাছে কি চায়? যদিও তাকে এই মুহূর্তে দেখে মনেই হচ্ছে না যে সে মাতালামী করে বেড়ায়।
এক্কেবারে ফিটফাট ফুলবাবু।
‘ধ্যত্তেরী চাই! এই সব কি ভাবছি আমি?’ বিড়বিড় করে নিজেকে গালি দিল মার্টিন, ভাবল, জেনি তো এই শহরের মেয়ে। শহরের তাবৎ লোকজন ওকে সমীহ করে বেড়ায়। সুতরাং যে কেউ প্রয়োজনের খাতিরে ওর সাথে কথা বলতে পারে। এ নিয়ে এত সন্দেহ কিসের?
মার্টিন দেখল, জেনি লোকটার সাথে ফুটপাতের ওপাশের ডানদিকের গলিতে গিয়ে ঢুকল এবং লোকটাকে কিসব জিজ্ঞেস করতে করতে গলির ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল।
জানালার সামনে থেকে সরে এল মার্টিন।
আপাতত জেনির চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল ও। কাঠের দেয়ালে টাঙানো ুদে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুন নিজের চেহারা সুরত জরিপ করল। দেড়-দু’দিনের নাকাটা দাড়ি-গোঁফ ইতমধ্যেই জঙ্গলের রূপধারন করতে শুরু করছে। দাড়ি-গোঁফের ওপাশে মার্টিনের চোহারা দেখে মনেই হবে না ও সবে মাত্র পঁচিশ বছরে পা রেখেছে। অথচ দেখলে মনে হয় পাক্কা ত্রিশ বছরের তাগড়া জোয়ান। তাছাড়া সদ্য গজিয়ে উঠা দাড়ি-গোঁফ ওর আসল চেহারাতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এবং মার্টিন আশা করছে, তার আসল চেহারা যেন কারো চোখে দ্রুত শনাক্ত হতে না পারে। আর সে এটাও চায় না যে কেউ যেন ওর সম্পর্কে অতিরিক্ত আগ্রহ প্রকাশ করুক। কেননা, আজ পর্যন্ত মার্টিনকে নিয়ে যারা মাত্রাতিরিক্ত কৌতুহলী হয়েছিল তাদের কাউকেই সে বেঁচে থাকতে দেয়নি।
পেছনে ফেলে আসা অতীতের কথা ভেবে মার্টিনের ঠোঁটে ক্রুর হাসির রেখা ফুটে উঠল।
ঘাড়ের উপর দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বিছানার উপর রাখা মানি বেল্টের উপর প্রত্যাশিত নজর বুলাল ও। ওখানটায় পুরো পাঁচ হাজার ডলার আছে। আপাতত এগুলো একটা ব্যাংকে জমা রেখে কাজ শুরু করা যেতে পারে। যতদূর মনে হচ্ছে গ্রীন টাউনের লোকজন অন্যের ব্যাপারে নাক গলানো পছন্দ করে না। যদি তাই হয় তবে এখানে একটা র্যাঞ্চ হাউস করার স্বপ্ন আছে ওর। যদিও মার্টিন জানে এসব করতে গেলে এখানকার প্রভাবশালী লোকদের দৃষ্টি এড়ানো সম্ভব না। আইনের ভেড়াজালের উটকো ঝামেলা তো আছেই। অবশ্য এদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখতে পারলে এব্যাপারে তেমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যদিও মার্টিন এটাও জানে যে-ওর লেজে বেশকিছু ঝামেলা জড়িয়ে আছে, এবং এগুলোকে পরিষ্কার করতে না পারলে পরিকল্পনা মাফিক কাজ করা সম্ভব না। কিন্তু মনে হচ্ছে এখনও জঞ্জাল সাফ করার সময় হয়নি। ওর হিসেব হতে জঞ্জালগুলো নিজ থেকেই ঝড়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবে। অথবা বলা যায় অন্য কেউ একজন ওর হবেই কাজটা করে দিতে পারে। এবং সম্পূর্ন ওর অজান্তেই! মোটকথা, সবকিছু সুবিধেমত এগোলেই হল, বাকিটা মার্টিন নিজেই সামাল দিতে পারবে। প্রয়োজন হবে না আর কারও...
ঠক্! ঠক্! ঠক্!
কেবিনের দরজায় শব্দ হতেই বাস্তবে ফিরে এল মার্টিন। স্যালিম্যানের কন্ঠ শুনে দরজা খুলে দিল। করিডরে হাস্যোজ্জ্বল মুখে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। এতই শুকনো যে, কেবিনে ঢুকতে হলে কুঁজোই হতে হবে মনে হয়। কিন্তু কেবিনে ঢুকল না স্যালিম্যান। বাইরে দাঁড়িয়েই বলল, ‘গুড মর্নিং স্যাহ্্, আশা করি রাতটা ভালই কেটেছে।’
‘অবশ্যই বন্ধু, তোমার হোটেলটা সত্যিই চমৎকার! আমি সন্তুষ্ট।’ দরজার চৌকাটে হেলান দিয়ে দাঁড়ানোবস্তায় বলল মার্টিন।
‘ধন্যবাদ স্যাহ্,’ হাসির মাত্রা দ্বিগুন হল হ্যালিম্যানের। ‘স্যাহ্, তোমার খোঁজে মিস্টার রাবার্টসন নিচে দাঁড়িয়ে আছে।’
‘রবাটসন!’
‘ত্রিপল জে র্যাঞ্চের ফোরম্যান। সম্ভবত মিষ্টর জ্যারি তাকে পাঠিয়েছে।’
‘তুমি কি জে এন্ড জেনি রেস্তোরাঁর মালিকের কথা বলছো?’
‘ঠিক ধরেছো স্যাহ্!’
‘ঠিক আছে, তুমি নিচে গিয়ে তাকে অপো করতে বল। আমি একটু পরেই আসছি।’ বলেই স্যালিম্যানের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল মার্টিন।
স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় বিছানার কাছে গিয়ে গায়ের শার্টটা খুলে ফেলল। ওর লোমশ চওড়া বুক আর পেঠানো মাসল দেখে কেউ বুঝতে পারবে এ শরীরে অসম সাহস ও শক্তি মজুত আছে। প্রসস্থ কাঁধ, মজবুত ও বলিষ্ঠ দেহ ওর।
বিছানা থেকে মানিবেল্টটা তুলে নিয়ে শোল্ডারে বাঁধল ও, তারপর গতকাল রাতে দর্জির কাছ থেকে কেনা নতুন চকচকে ফানেলের শার্টটা উপরে পরল। নিজেকে যতটুকু সম্ভব পরিপাঠি করে গুছিয়ে নিয়ে কোমরে নিজের গানবেল্ট ঝুলিয়ে বের হয়ে এল কামরা থেকে।
ভাবছে, মিষ্টার জ্যারি তাকে কি কারনে ডেকে পাঠাতে পারে। জবাব একটাই, তার ছেলেকে গন্ডগোলের হাত থেকে রা করার জন্য হয়ত একগাদা ধন্যবাদ ও প্রসংশার বুনোবাক্য জারি করা। সেই সঙ্গে ভিকির ব্যাপারে সতর্ক করা। হাঁ, এপর্যন্ত হলে ভালই- কিন্তু লোকটা যদি ওর সম্পর্কে অন্যকোন প্রশ্ন করে বসে?
এসব ব্যাপার খুব কমই সহ্য করতে পারে মার্টিন। তবে এপর্যায়ে সেরকম কিছু হলে কোন সমস্যা নেই। নতুন আগত আগন্তুক সম্মন্ধে জানার আগ্রহ টুকটাক সবারই থাকে।
ধীর পদেেপ নিচে নেমে এল মার্টিন। কাউন্টারের সামনে এক বেটেখাট মোটাকৃতির লোককে দাঁিড়য়ে থাকতে দেখল। কাউবয় পোশাক পরনে, মাথার হ্যাটটা টাকের ওপর বসানো। বয়স চল্লিস পঞ্চাশের মত হবে। গোলগাল, মোটকু মার্কা চেহারা।
বুটের ভারি শব্দ শুনে ঘুরে সিঁড়ির দিকে তাকালো লোকটা। মার্টিনকে দেখতে পেয়ে ীন হাসল। ভাবলেশহীন চেহারা ঠিকই, কিন্তু আন্তরিক কন্ঠে এগিয়ে এল। ‘হ্যালো মিষ্টার, তুমি নিশ্চয়ই মার্টিন?’
লোকটার সামনে এসে দাঁড়াল মার্টিন। ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসি ফুটিয়ে হত বাড়িয়ে দিল। ‘ঠিকই চিনেছো মিষ্টার রাবার্টসন।’
ওর সাথে হাত মিলিয়ে চোখজোড়া কুঁচকালো রবার্টসন।
বলল, ‘উঁহু! আমাকে শুধু রবার্ট ডাকলেই চলবে।’ তারপর মার্টিনকে মেকি জরিপের ভঙ্গিতে নিজের বিশাল ভ্র“ জোড়া নাচালো, ‘হুম! জ্যান তবে মিথ্যে বলেনি-তুমি সত্যিই সুদর্শন!’
‘ধন্যবাদ!’ নিজের প্রশংসা শুনে মোটেও বিচলিত হল না মার্টিন। ও জানে, রবার্টের মত লোকেরা খুউবই মিশুক প্রকৃতির হয়। আর এধরনের লোককে ওর কাছে স্বভাবতই ভাল লাগে। এরা নির্ভেজাল মানুষ। যেছে পড়ে ঝামেলা বাধানো পছন্দ করে না। আবার ঝামেলাবাজদের ছেড়েও কথা বলে না।
হোটেল থেকে বেরিয়ে এল দু’জনে।
হিচরেইলে রবার্টের ঘোড়াটা বাধা ছিল। ওটার পাশে নিজে স্ট্যালিয়নটা দেখে অবাক হল না মার্টিন। কারন, হর্সল্যার ছেলেটাকে ও আগে থেকেই বলে রেখেছিল ওর ঘোড়াটা যেন হোটেলের সামনে রেখে যায়।
দু’জনেই নিজেদের ঘোড়ার চড়ে বসল। ধীর পদেেপ রওনা হল ওদের ঘোড়া। কিন্তু কিছুদূর এগোতেই শহরের পুবদিকের কিছু দোকানপাটের ওপাশে অস্বাভাবিক ধোঁয়া আর হৈচৈ কানে এল ওদের।
ভ্র“ কুঁচকাল দু’জনেই। তবে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল সেদিকে।
ব্যাপারটা কি দেখা দরকার।
ঘটনাস্থলের দিকে যতই ওরা এগিয়ে যাচ্ছে ততই লোকজনের চিৎকার আর চোঁচামেচি কানে জোড়াল আঘাত হানছে। স্পস্টই বোঝা যাচ্ছে যে ওখানটায় আগুন ধরেছে এবং আগুন নেভানোর প্রচেষ্ট চালিয়ে যাচ্ছে সবাই।
চার
হুড়মুড় করে শেরিফের অফিসে এসে ঢুকল একটা লোক। তাকে দেখে মনে হচ্ছে ভূতের তাড়া খেয়ে একশো কিলো একটানা ছুটে এসেছে। হাপরের মত হাঁপাচ্ছে সে।
জেনিকে শেরিফের সাথে কথা বলতে দেখে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ল লোকটা। যেন কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। তাকে উদ্ধার করল শেরিফ।
‘ঠিক আছে, কি বলতে চাও বলে ফেল!’ কর্কশ কন্ঠ শেরিফের। অন্য সময় হলে বিনা অনুমতিতে অফিসে প্রবেশের অপরাধে লোকটার চৌদ্দগোষ্ঠী যাচাই করে ফেলত সে।
নিজেকে সামলে নিয়ে কপালের ঘাম মুছল লোকটা। বলল, ‘শেরিফ, নেভিসের পত্রিকা স্টল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে! কারা যেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল বেচারার দোকানে।’
‘হোয়াট!’ ঝট্ করে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল শেরিফ। পরমুহূর্তে জেনির দিকে তাকিয়ে কন্ঠ স্পস্ট করল।
‘হ্যাঁ, বেচারা নেভিস মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।’
‘কি বলছো! তাড়াতাড়ি চল এখুনি!’ বলে ডেস্ক থেকে নিজের হ্যাটটা মাথায় চাপিয়ে জেনির দিকে তাকিয়ে বরল, ‘স্যরি ম্যাম, আমাকে যেতে হচ্ছে। তুমি অবশ্য আমার কথাগুলো বিবেচনায় রেখ। পরে তোমার সাথে দেখা হবে।’ বলে আর দেরী না করে অফিস থেকে বেরিয়ে গেল সে। জেনিও উঠে দাঁড়িয়ে ছিল। তার দিকে তাকিয়ে মাথার হ্যাট খুলে নড্ করল লোকটা। তারপর খেয়াল হতেই সেও অফিস ছাড়ল।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে শেীরফ আবিষ্কার করল অস্থিরতা থেমে গেছে। কেবল মৃদু গুঞ্জন আর কথোপকথন চলছে সবার মাঝে। ঘোড়ায় বসেই দেখল নেভিসের দোকানের অবস্থা। একবারে ছাড়খার।
লাগোয়া দু’টো দোকানে কিছুটা আগুনের ছাঁচ্ লাগলেও তেমন কোন তি হয়নি। কিন্তু নেভিসের দোকান পুড়ে একেবারে কালো ছাঁইয়ের স্তুপ ভনে গেছে। পানি দিয়ে আগুন নেভানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ। তবে কুন্ডুলী পাকিয়ে ধোঁয়ার রেশটা এখনও রয়ে গেছে।
লোকজনের একটা ঝট্লার ওপর এবার নজর গেল শেরিফের।
ঘোড়া ছেড়ে সেদিকে এগোল সে।
তাকে দেখে লোকজনের গুঞ্জন ফিস্ফিসানিতে পরিনত হল।
ভীড় ভাঙল সবাই।
শেরিফ প্রথমে দেখল ত্রিপল জে র্যাঞ্চের ফোরম্যান রবার্টসনের বিরক্ত কুঞ্চিত মুখ। আর তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মার্টিন!
‘শেরিফ!’ রবার্টসনের ঝাঁঝালো কান্ঠস্বর।‘ নিবোধ এই লোকগুলোকে সামলাও দয়া করে!’
‘আমি জানতে পারি হচ্ছেটা কি এখানে?’ রবার্টসনের কথার খেঁই ধরে বলল শেরিফ।
‘এরা সবাই দাবী করছে আমি নাকি মি.নেভিসের দোকানে আগুন লাগানোর ব্যাপারে জড়িত!’ মার্টিনের নির্লিপ্ত জবাব।
‘অথচ মি.মার্টিনকে আমি এইমাত্র হোটেল থেকে নিয়ে এসেছি...’ বলল রবার্টসন।
‘না, মিথ্যে কথা!’ ভীড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন চেঁচাল।
‘হ্যাঁ, এই লোকটাই দোকানে আগুন ধরিয়েছে...!’ অন্য একজন বলল।
হৈচৈ শুরু হয়ে যাচ্ছিল, শেরিফ হাত তুলে বজ্রকন্ঠ জারি করল,‘তোমার কি থামবে!... নেভিস কোথায়?’
ভীড়ের মধ্য থেকে একজন বেরিয়ে এল। খর্বকায় চেহারা। চোখ দু’টো জবা ফুলের মত ঢগঢগ হয়ে আছে। কান্নার ফল।
‘তোমার কি বক্তব্য জানতে পারি হে?’ শেরিফের প্রশ্ন।
‘হ্যাঁ শেরিফ, এই লোকটাই আমার দোকান পুড়িয়েছে!’ আঙুল তুলে মার্টিনকে দেখাল নেভিস। কিন্তু মার্টিনকে বিন্দুমাত্র বিচলিত দেখা গেল না। যে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।
‘কি করে বুঝলে, সে কি তোমার সামনে দাঁিড়য়ে দোকানে আগুন লাগিয়েছিল?’
‘না, লোকটা আগুন লাগিয়ে পালাচ্ছিল- আমি তাকে দেখতে পাই।’ বলে একজনের হাত থেকে একটা হ্যাট তুলে নিয়ে শেরিফকে দেখাল। ‘পালাবার পথে এর মাথা থেকে এই হ্যাটটা পড়ে যায়।’
শেরিফ হ্যাটটা হাতে নিল। মার্টিন অবাক হল ওটা সত্যিই ওর নিজের হ্যাট দেখে।
এখন ওর মাথায় হ্যাট নেই।
হঠাৎ মনে পড়ল গতরাতে ওর কেবিনে অন্ধাকরের মাঝে খুট্খুট শব্দ হচ্ছিল। এখন বুঝতে পারছে চোরটা ভীষন চতুর। কিন্তু?...
ভিকির কাজ নয় তো!
‘এটা কি তোমার হ্যাট মি. মার্টিন?’ শেরিফের প্রশ্ন।
‘হ্যাঁ..’ ইতস্তত কন্ঠ মার্টিনের,‘ কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না এটা এখানে এল কি করে?’
‘যেখানে তুমি স্বয়ং এসেছিল তাই!’ কর্কশ কন্ঠ নেভিসের।
‘তুমি কি আমার চেহারা দেখেছো?’
‘অবশ্যই, তুমি...তোমার গা জ্বলানো হাসিটা আমার এখনও মনে আছে।’
‘বাজে কথা বলো না নেভিস! ভাল করে মনে করে দেখ কার চেহারা তুমি দেখেছিলে?’ শেরিফের কর্কশ ধ্বনি।
‘বলেছি তো, এই লোকটাই কাজটা করেছে।’
‘অতএব...’ যেন আর করার কিছুই নেই এমন ভঙ্গিতে মার্টিনের দিকে তাকাল শেরিফ। ‘বুঝতেই পারছো স্ট্রেঞ্চার, তোমাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে...’
‘এ হতে পার না শেরিফ!’ হাঁক ছাড়ল রবার্টসন। ‘তুমি ইচ্ছে করলে স্যালিম্যানের সাথে কথা বলতে পার।’
‘সবই হবে রবার্ট, কিন্তু প্রথম যে কাজটা...’
‘তিপূরন চাই আমদের!’ ভীড়ে প্রচন্ড গুঞ্জন উঠল।
‘দেখ শেরিফ, আমি তিপূরণ দিতে রাজি আছি কিন্তু আমি দোষী নই।’ মার্টিন এগিয়ে এসে শেরিফের পাশে দাঁড়াল।
‘আমি নিরুপায়। তোমাকে অবশ্যই আমার সাথে যেতে হবে। অফিসিয়াল ডিউটি।’ শ্রাগ করার ভঙ্গি করে বলল শেরিফ।
আর কথা বলল না মার্টিন।
জানে লাভ হবে না। যদিও এব্যাপারে সে মোটেও বিচলিত নয়। কারণ এধরনের কাঁচা দুষ্টুমী ভিকি ছাড়া আর কেউ করবে না।
‘তুমি চিন্তা কর না মি.মিস্টার আমি...’ রবার্টসন কিছু বলতে চাচ্ছিল। বাধা দিয়ে হাসল মার্টিন। ‘ভেব না, আমার কোন সমস্যা হবে না!’ বলে লোকজনের ভীড়ে একবার নজর বুলাল ও। তখুনী দেখতে পেল ভিকিকে, সাথে ওর চ্যালা-চামুন্ডারাও আছে।
শয়তানী হাসি ওদের ঠোঁটে! কিন্তু মার্টিন শুধু ওদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ্পী দিল আর মুচকি হাসল।
‘মার্টিন ল্যাসলোর একজন বাউন্টি হান্টার ম্যাম..’ অফিস ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলা শেরিফের এই একটি বাক্যই বারবার প্রতিধ্বনিত্ব হচ্ছে জেনির মনে।
গ্রীনটাউনে বাউন্টি হান্টার!
এরমানে বড় রকমের একটা গোলমাল হওয়ার সম্ভাবনা আছে শহরে। বাউন্টি হান্টাররা শখ করে ঘুুরে বেরায় না। পুরস্কারের বিনিময়ে কুখ্যাত আউট-ল অথবা দাগী পলাতক আসামীর খুপরী উড়িয়ে দেয়াই এদের কাজ।
আর যদি মার্টিন একজন বাউন্টি হান্টার হয়ে থাকে তবে সে কার খোঁজে এখানে এসেছে?
জেনির জানা মতে শহরে এপর্যন্ত এমন কোন আগন্তুকের আগমন ঘটেনি যার নামে ওয়ান্টেড জারি করা হয়েছে। তাছাড়া শহরে যেসমস্ত দঙ্গলবাজেরা চুটকী করে বেড়াচ্ছে তাদের কারো নামে এখন পর্যন্ত কোন আইনী পদপে গৃহিত হয়নি।
প্রকাশ্যেই লাফাঙ্গা করে বোড়াচ্ছে সবাই। সুতরাং মার্টিন ল্যাসলোর লোকটার এই শহরে আসার পেছনে অন্য কোন কারন থাকলেও থাকতে পারে।
জেনি অবশ্য শেরিফের কথা প্রথমে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু শেরিফ যখন হটলিস্ট মেমো ওর চোখের সামনে মেলে ধরে বলল,‘গতকাল স্যালিম্যানের হোটেলের সামনে মাতাল সেজে কাগজটা হাতিয়েছি ম্যাম...’ তখন সরাসরি মেমোর তালিকায় মার্টিনের বুলবিট ছবি দেখে আর সংশয় থাকেনি ওর মনে। মার্টিন ল্যাসলোর একজন বাউন্টি হান্টার এব্যাপারে আর কোন সন্দেহ নেই।
অন্যকোন মেয়ে হলে শেরিফ তাকে মার্টিন সম্পর্কে আগাম সতর্কতার বিষয়ে জানানোর ধারই ধারত না। এটা খুব ভাল করেই জানে জেনি, এবং কেন সেটা আরো ভাল করে জানে। কিন্তু ঔই চিন্তায় চিন্তিত নয় জেনি।
শেরিফ অফিস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেও বেরিয়ে এসেছে অফিস থেকে। নিজেদের রেস্তোঁরায় ঢুকে সোজা গিয়ে কিচেনে ঢুকেছে ও। ওর বাবা মিস্টার জ্যারি যখন জানতে পারবে মার্টিন একজন বাউন্টি হান্টার তখন ভদ্রলোকের মাথায় কেবল একটা ধান্ধাই কাজ করবে- আর সেটা হচ্ছে মার্টিনকে ভাগানো। এমনিতেই র্যাঞ্চ নিয়ে ভীষন ঝামেলার মধ্যে দিন কাটছে, তার ওপর বাড়তি ঝামেলা বাধলে ঠিকে থাকাই দায় হয়ে পড়বে শহরে।
‘কিন্তু এসব নিয়ে আমি ভাবছি কেন!’ মাথা ঝারা দিয়ে নিজেকে ধমক লাগাল জেনি। বেসিনে হাত ধুয়ে আয়নার সামনে ঝুলানো তোয়ালেতে হাত মুছল, তখুনী আয়নার কাঁচে নিজের পেছনে কাউকে দেখতে পেয়ে ঝট্ করে ঘুরে দাঁড়াল ও।
‘জনসন!’ উল্লাসিত ভাবাবেগ প্রকাশ পেল জেনির কন্ঠে। সামনে দাঁড়ানো যুবকের আপাদমস্তক মেপে শান্তকন্ঠে বলল, ‘তোমার তো আজ গ্লীটারসিটিতে থাকার-’ বাধা পেল জেনি।
‘উহু...গ্লীটারসিটিতে থাকার বদলে আমার এখন পরপারের বাসিন্দা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু অফসোসের বিষয় আমি এখন তোমার সামনে!’ চাপা রসিকাতর সাথে বলল যুবক।
‘বাজে বক না তো! সত্যি করে বল ব্যাপার কি?’ অভিমানি কন্ঠে জিজ্ঞেস করল জেনি।
‘যা বলেছি তাই সত্যি ম্যাম...দেখতেই তো পাচ্ছো! গ্লীটারে যাওয়া হয়েছে তো ঠিকই, কিন্তু পথে বোরহানের আউট-ল’রা হামলা করেছিল, ভাগ্যিস্ ঔই সময় অচেনা ঔই আগন্তুক হাজির না হলে আমাকে হয়ত...’ জনসনের ঠোঁট চাপা দিল জেনি। ঘনিষ্ট হয়ে এল জনসনের সামনে।
‘ওভাবে বলো না তো! শুনতে খারাপ লাগে।’
জনসন মুচকী হেসে ওকে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছিল কিন্তু দ্রুত নিজেকে গুটিয়ে নিল জেনি। বলল, ‘কিন্তু হয়েছিল কি?’
‘গ্লোসি মাউন্টেনে তাবু ফেলেছিলাম আমরা, ফায়ার কস্টে করে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম, হঠাৎই অন্ধকার ফুঁড়ে কোথ্থেকে বৃষ্টির মত গুলির ঝড় আমাদের কাবু করে ফেলল। ওখানকার ট্রেইল দিয়েই যাচ্ছিল এক আশ্বারোহী, আমাদের ইশারা পেয়ে সাহায্য করতে এগিয়ে এল। বলতে পার ওর উসিলায়ই সে যাত্রা বেঁচে গেছি আমরা। যদিও ডাউডি সামান্য আহত হয়েছে। কিন্তু জিনিসপত্রের কোন তি হয়নি।’
‘যাক্, তেমন কিছু হয়নি।’ ফস্ করে শ্বাস ছাড়ল জেনি, ‘লোকটা কি তোমাদের সাথেই এসেছে?’
‘না, সে আমদের আগেই চলে এসেছে। আমি তখন গ্লীটারে পূনরায় রওনা দিয়েছি। আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল সামনে কোন শহর আছে কিনা। আচ্ছা, সর্বশেষ কে এসেছে শহরে বলতে পার তুমি?’
‘মার্টিন নামের একজন,’ জানাল জেনি। উৎকন্ঠায় কপালে ঘাম জমেছে ওর।
‘আরে হ্যাঁ! লোকটা তো এ নামই আমাদেরকে বলেছিল। যাক্, ওকে ধন্যবাদ দেয়ার একটা সুযোগ তবে পাওয়া গেল!’
‘তার আগে তিুমি এখন আমাকে এটা বল যে নাস্তা সেরেছো কিনা।’ প্রসঙ্গ পাল্টে ঘুরে দাঁড়াল জেনি। ওর কথা শুেেন চোখমুখ কুঁচকে ফেলল জনসন। পেটে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘তুমি কি করে ভাবলে শহরে থাকতে আমি তোমারটা ছাড়া অন্যকারো তৈরী ন্সাতা খাব?’ বলতে বলতে জেনিকে পেছন থেকে ঝাপ্টে ধরল ও। নিজেকে ছাড়াতে পেছনদিকে জনসনকে কাতুকুতু দিতে লাগল জেনি। কাতুকুতুর চোটে ওকে ছাড়তে বাধ্য হল জনসন। পরনেই দু’জনে দুষ্ঠুমী হাসিতে ফেটে পড়ল।
লাজুক হেসে জনসনের বুকে মুখ লুকালো জেনি। ও জানে না ফোরম্যান রাবার্টসনের এই পুত্রের মাঝে কি আছে, কিন্তু ও এটা জানে এই একজনকেই ভালবাসা যায়। স্বপ্ন সাজাতে হলে স্বপ্নের এই পুরুষই ওর একমাত্র ভরসা...।
পাঁচ
খুব বেশি সময় শেরিফের অফিসে বসে থাকতে হল না মার্টিনকে। রবার্টসনের বদৌলতে ছাড়া পেয়ে গেল ও। তবে জামিনের পুরোটা না হলেও কিছুটা দিতেই হল। শেরিফের অফিস থেকে বেরিয়ে আসার সময় মার্টিন স্পষ্ট ল্য করল কিছু দূরে একটা পিলারের গায়ে হেলান দিয়ে এদিকেই নজর রাখছিল একটা লোক। ওদেরকে বেরিয়ে আসতে দেখে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল লোকটা। পাত্তা না দিয়ে নিজেদের ঘোড়ার চেপে বসল ওরা। শহরকে পেছনে ফেলে রওনা দিল ত্রিপল জে র্যাঞ্চের দিকে।
আঁকাবাঁকা এবড়ো-খেবড়ো ট্রেইল ধরে ওরা দু’জনে যখন মাঝারি গতিতে রাইড করছে তখন রবার্টসন মার্টিনকে জিজ্ঞেস করল,‘গত পরশু দিন তুমি কোথায় ছিলে মি.মার্টিন?... জানতে চাচ্ছি কোথ্থেকে এসেছো তুমি ?’
রবার্টসনের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে হাসল মার্টিন। জানাল,‘গ্লীটার সিটি নামের একটা শহর। ওখান থেকেই একটানা এখানে, যদিও গ্লীটারসিটিতেও ছিলাম অন্যখান থেকে এসে!’
এবার ওর দিকে তাকলো রবার্টসন। লোকটার ভাবলেশহীন রসিক চোহারায় কৌতুহলের রেখা ফুটে উঠল।
‘গ্লীটাসিটি! আশ্চর্য!! এখন তুমি নিশ্চয় অস্বীকার করবে না যে এখানে আসার পথে তুমিই গ্লোসি মাউন্টেনে একদল আ্যম্বুশকারীর হামলা থেকে একটা ওয়াগ্যান সামলে ছিলে লোকসুুদ্ধ?’
‘এবং ওভার চীফ জনসন নামের ছেলেটা তোমারই লোক। ওদের কাছ থেকেই শহরের ঠিকানা পেয়েছিলাম আমি। নচেৎ দেিনর কাপাসির দিকে উদ্দেশ্যহীনভাবে রওনা হাতাম আমি। ছেলেটাই বলেছিল ত্রিপল জে র্যাঞ্চের কাজে সে গ্লীটারে যাচ্ছিল, সে কি ফিরেছে?’
‘হ্যাঁ, আজ ভোরেই কাজ সেরে ফিরেছে। ও আমার ছেলে। পুরো ঘটনাটার কথাই শুনেছি ওর মুখে।’
‘আর কি শুনেছো?’ সঙ্গে সঙ্গেই জিজ্ঞেস করল মার্টিন। হঠাৎই আড়ষ্ট হয়ে গেল ওর মন।
‘আর কিছু জিজ্ঞেসও করিনি।’ দুলতে দুলতে জবাব দিল রবার্টসন,‘তবে জ্যারি মনে হয় এতনে তোমার সম্পর্কে সব খোঁজ খবর নিয়েই ফেলেছে। নতুন যারাই আসে তাদের আগাগোড়া যাচাই করা ওর অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। গত কয়েকদিন আগের ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় ওর অনেক টাকা গচ্ছা গেছে। আমাদের নিজেদের লোকদের মধ্যেই কেউ জোচ্চুরি করে গরু সরানো ব্যাপারে সাহায্য করছে রাসলারদের। ঘটনাগুলো ঘটছে তখুিনি যখন নতুন কারো আগমন ঘটে শহরে এবং ঘটনা ঘটার পর বেমালুম উধাও হযে যায় নতুন মুখ! মূলত: এসব কারণেই নতুন আগন্তুকদের উপর কড়া নজরদারী রাখার ব্যবস্থা নিয়েছে জ্যারি। তবে...’
‘তবে আমাকে দেখে নিশ্চয়ই তেমন কেউ মনে হচ্ছে না তোমার?’ রাবার্টসনের কথা শেষ করল মার্টিন। ‘সুতরাং, তুমি নিশ্চিত থাকো-র্যাঞ্চে পৌঁছেই তুমি আমার সম্পূর্ন অন্যরকম পরিচয় পাবে মি.জ্যারির মুখে।’ বলেই মুখ বাঁকা করে হাসল ও।
যে কথা শুনবে বলে ভেবেছিল তা না শুনায় আড়ষ্ঠ ভাবটা উধাও হল ওর।
আয়েশ করে বসল এবার নড়েচড়ে। ওকে আর কিছু জিজ্ঞেস না করে শ্রাগ করল ফোরম্যান। একটু থেমে প্রসঙ্গ পাল্টালো। জিজ্ঞেস করল, ‘তোমাকে জেলের ভাত খওয়ানোর শখ ছিল মনে হয় ভিকি শয়তানটার!’
‘হঠাৎ একথা বলছো কেন?’
‘সবে শহরে এসেছো তুমি, লোকজনের সঙ্গে এখনো আলাপ পরিচয় হয়ে ওঠেনি। নেভিসকে টাকা দিয়ে তোমাকে জেলে ঢুকানো চেষ্টা করেছিল ব্যাটা! তুমি কি বুঝতে পেরেছো?’
‘হুম্ম...আর তাই তো ফিরে গিয়ে নেভিসের কলার ঝাপ্টো ধরে অযথা সময় নষ্ট করতে চাচ্ছি না!’ নির্লিপ্ত স্বরে মাথা ঝাঁকাল মার্টিন।
‘তবে এটুকু জেনে রেখো, যুঁতসই জবাব যদি না দিতে চাও তাহলে একটা দিনও শান্তিতে চলাফেরা করতে পারবে না। বুলেট ছোঁড়ার মুরদ বিচ্ছিুটার নেই, কিন্তু পদে পদে জ্বালিয়ে মারবে।’
‘অসুিবধে নেই, মজাই পাব। অন্তত নিজের অবস্থানটা বুঝে না ওঠা পর্যন্ত ছেলেটার সাথে হাডুডু খেলে শরীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখা যাবে।’
‘ভালই বলেছো!’ বলে ঘোড়ার গতি কমাল রবার্টসন।
মার্টিন দেখল ওদের ডানপাশে ট্রেইলের উঁচু ঢিবির নীচে মোটামুটি এক তৃণভূমির বুকে ছোট্ট একটা লেক, লেকের তীর ঘেষে ফুলের বাগান আর বাগানের একটা পাশে ভেড়াবেষ্টনীর ভেতর দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক র্যাঞ্চ হাউস।
ওটার পেছনে ছবির মত প্রকৃতি ছড়িয়ে আছে। কিছু পাহাড়ী খালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘাস খাচ্ছে প্রচুর গরু। কটনউড গাছের বন ছড়িয়ে রয়েছে র্যাঞ্চের উত্তর পাশে। বনের দূরত্বটা অনেক দূর পর্যন্ত বি¯তৃত।
‘এসে গেছি, এটাই আমাদের র্যাঞ্চ।’ স্যাডল ছেড়ে জানাল ফোরম্যান।
ঘোড়ার পিঠ ছেড়ে লাগাম পাকড়াও করল মার্টিন। নিরবে ফোরম্যানকে অনুসরণ করে হাঁটতে লাগল।
র্যাঞ্চের গেট পর্যন্ত জমির বুকে আজব যত লতাগুল্মোর রাজত্ব। ইউক্যালিপ্টাস্ ঝাড়েরও কমতি নেই এদিক-সেদিক।
রবার্টসনের সাথে গেট পেরুলো মার্টিন। বাগানের মাঝখান দিয়ে কংক্রিট বিছানো সরু রাস্তাটা গিয়ে ঠেকেছে র্যাঞ্চ হাউজ স্টোরে।
চোঁকামুখো হ্যাংলামার্কা এক কাউবয় এসে ওদের ঘোড়া দু’টো সরিয়ে নিয়ে গেল। আরো জনা পাঁচেক কাউবয় কাজ করছে লিভারিতে। কেউ ফিরেও তাকায়নি ওদের দিকে। নিজেদের কাজে ব্যস্ত সবাই। পাশের একটা কুকশ্যাক থেকে কুন্ডুলী পাকিয়ে চিমনি দিয়ে বেরিয়ে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে ধোঁয়ার রেশ।
আগোছালো হলেও পরিবশটা মন্দ নয়।
করাল, ছাউনি, কুকশ্যাক, বাঙ্কহাউস এসবই মূল র্যাঞ্চ হাউসের বারান্দায় ওঠার সরু রাস্তার দু’পাশে নির্দিষ্ট করে তৈরী করা হয়েছে। আবার লেকের পাড়ে গৃহপালিত পশুর খামার হাউসও দেখা যাচ্ছে। সূর্যের আলো প্রতিফলিত হওয়ায় চিকচিক করছে লেকের পানি।
চারিদিকে নজর বুলাতে বুলাতে র্যাঞ্চহাউসের বারান্দার গ্যালারিতে এসে উঠল ওরা। ঠিক তখুনী ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একলোক। দেহের গড়ন ও আকৃতি হুবুহু রবার্টসনের কাছাকাছি। পরনের পোশাক দেখলেই বোঝা যায় লোকটা সৌখিন। পা থেকে গলা অবধি রবার্টসনের মানিকজোড় বলে চালিয়ে দেয়া যায় লোকটাকে। চোহারায়ও রসিকতার ছটা লেগে আছে, তবে খুবই অভিব্যক্তিহীন চোখ। মুখের অবয়ব দেখেই বোঝা যায় আভিজাত্যের কোঠায় আসতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে জীবনে। গায়ের রঙটায় তামাটে ভাজ পড়লেও হলুদ চুল আর গোঁফের অন্তরালের চেহারাটাই বলে দিচ্ছে এ লোকটাই জ্যারি, এখানকার কর্ত।
রবার্টসনের সঙ্গে মার্টিনকে দেখতে পেয়ে ভুরু কুচকালো সে। চেহারায় ঝিলিক মারল জেনির অবয়ব, চোখজোড়া বলে দিল জ্যানের ছটাক।
হ্যাঁ, বাপ হিসাবে এ লোকই উপযুক্ত।
‘আমাদের শহরের নতুন অতিথি জ্যারি-’ ইঙ্গিতে মার্টিনকে দেখাল রবার্টসন। ‘কিন্তু তোমার চেহারা বলছে অন্যকিছু।’
‘বসে পড় তোমরা’ বলে বারান্দায় রাখা একটা চেয়ারে বসে বেঞ্চ দেখাল জ্যারি। বসার ফাঁকে মার্টিনের আপাদমস্তক জরিপে ভুলল না। ‘এত দেরী হল কেন তোমার রবার্ট?’
‘শহরে ছোট্ট একটা ঝামেলা হওয়ায়...’ বলতে বলতে নিজের গলায় ঝোলানো হ্যাট খুলে কাঠের দেয়ালে হুকে লটকালো রবার্টসন। ‘বুঝতেই পাচ্ছো! কিন্তু এখন তুমি আমাকে সব খুলে বল।’
‘বলছি....হাইডি মি. মার্টিন, তোমাকে সরাসরি দেখে ভাল লাগছে।’
মার্টিনের দিকে তাকিয়ে হাসলো র্যাঞ্চার। জবাবে নড্ করে সম্মান প্রদর্শন করল মার্টিন। ও ভেবিছিল স্বাভাবিক ভদ্রতা জারি করার জন্যেই লোকটা ওকে ডেকে পাঠিয়েছে। কিন্তু কথাবার্তার ধরন দেখে মনে হচ্ছে অন্যকিছু।
দাঁড়িয়ে ছিল ও, বেঞ্চটাতে বসে পড়ল। জায়েগাটা নিরাপদ।
‘প্রথমেই তোমাকে একাধারে কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমি মি.মার্টিন- তুমি গতকাল রাতে জ্যানকে ভিকির সাথে ঝগড়া করা থেকে বিরত রেখে রেস্তোরাঁটা অত রেখেছো। অন্যদিকে জনসনকে মারাত্মক ঝুঁকির হাত থেকে বাঁচিয়েছো...’ বুক পকেট থেকে একটা কিছু বের করার ফাঁকে বলছিল জ্যারি, বিরতী পেয়ে মার্টিন বলল, ‘বিনিময়ে নিজের যথেষ্ঠ স্বার্থও সিদ্ধি হচ্ছে আমার মি.জ্যারি, আমি...’ বাধা পেল ও।
‘তুমি যা বলতে চাইছো আমি হয়ত তা বুঝতে পারছি সান, কিন্তু ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। তুমি পশ্চিমের মানুষ, হয়ত রুতার মাঝেই বেড়ে উঠেছে, তাই হঠাৎ হঠাৎ হয়তবা পরিস্তিতির সাথে নিজের সামাঞ্জস্য বের করতে সময় ব্যয় কর।’ পকেট থেকে বের করা কয়েক টুকরো কাগজ রবার্টসনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল জ্যারি। ওগুলো হাতে নিয়ে মনোযোগ দিল রবার্টসন। ওর টাক মাথা চক্চক্ করে উঠল নাড়া পেয়ে।
‘তুমি ঠিক কি বলতে চাইছো মি.জ্যারি...’ বুঝতে পারছে না কিছু মার্টিন, সু একটা সন্দেহ দানা বেঁধেছে ওর মনে। বুঝতে পারছে না র্যাঞ্চার আসলে কোন প্রসঙ্গটা টেনে আনছে আস্তে আস্তে।
‘একটু ভেবে দেখ মি.মার্টিন, এ শহরে ঢুকার সাথে সাথেই তোমাকে ছোট্ট হলেও একটা ঝামেলার মধ্যে দিয়ে আসতে হয়েছে। ঢিঙাতে হচ্ছে উটকো কিছু জঞ্জালের জড়তা, অথচ তুমি হয়ত কল্পনাও করতে পারবে না-মাস খানেক আগেও এশহরের অবস্থা মোটেও এমন ছিল না। শহরবাসী বা র্যাঞ্চার বল সবাই খুব নিশ্চিন্তেই নিজেদের কাজ করত অনায়াসে। খুউবই শান্তশিষ্ট ছিল শহরের পরিবেশ। কিন্তু এখন- অহরহ ঝামেলা বাধছে শহরে। গরু চোরের প্রকট দেখা দিয়েছে। বেড়েছে ব্যাংক ডাকাতী, পাশাপাশি অনাহুত আগন্তুকদের সংখ্যা বাড়ছে। এসবের পেছনে কাদের মদদ আছে জানি না, কিন্তু সুবিধাভোগী কিছু লোক চাচ্ছে এ শহরটাকে নিজেদের স্বর্গরাজ্যে প্রতিষ্ঠা করতে। অন্তত চলমান আলামত দেখে তাই মনে হয়।’ হাত নেড়ে, ঘাড় নাচিয়ে কথাগুলো বলল র্যাঞ্চার।
নিজের জায়েগায় নড়েচড়ে বসল মার্টিন। র্যাঞ্চারের কথা শুনে মনে হচ্ছে ওর পরিচয়টা ওদের কাছে আর অজানা নেই। এবং যে কোন কারনেই হোক, র্যাঞ্চার ওকে বোঝাতে চাইছে লোকটা ওর শহরে আসার পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত। অর্থাৎ...
রবার্টসনকে কাগজগুলোর ওপর থেকে মুখ তুলে তাকাতে দেখে মার্টিন ওদের দু’জনের দিকে দৃষ্টি নাচিয়ে জানতে চাইল,‘তোমরা নিশ্চয়ই আমাকে এমন কেউ ভাবছো না যাদের কারণে ক্রমশ: তোমাদের শহরের পরিবেশ বিকৃত হচ্ছে?’
‘ইচ্ছে করে বোকার মত প্রশ্ন করাটা তোমাকে মানায় না সান! অবশ্য সত্যিই হয়ত তুমি আমার কথার তাৎপর্যটা আঁচ্ করতে পারছো না। সুতরাং সরাসরিই তোমাকে ব্যাপারটা বলে ফেলি-’ রবার্টসনের দিকে মুখ ফেরাল র্যাঞ্চার,‘কি বল রবার্ট?’
‘সেটাই ভাল হবে, অন্তত এগুলো দেখে তাই মনে হচ্ছে।’ হাতের কাগজগুলো দেখিয়ে সম্মতি জানাল রবার্টসন। কাগজগুলো নিজের হাতে নিয়ে মার্টিনের হাতে দিলে র্যাঞ্চার। বলল, ‘এগুলো দেখলেই তুমি বুঝতে পারবে আমি তোমাকে ঠিক কি বলতে চাইছি মি.মার্টিন।’
ওর ধারনাই ঠিক। সম্ভবত: জনসনই ওর ব্যাপারে গ্লীটারসিটিতে যাচাই করে এগুলো জোগাড় করে এনেছে, অথবা কোনওভাবে খবরের পত্রিকার সাথে লিফলেট আকারে এগুলো এ শহরে পৌঁছেছে। আর যদি তাই হয় তবে তো নিজের পরিচয় গোপন করে কোন লাভ নেই।
‘মি.জ্যারি, এখন আমি বুঝতে পারছি তুমি কি বলতে বা বোঝাতে চাইছো আমাকে। আসলে তোমার ধারনা আমি একজন বাউন্টি হান্টার, আর তাই নিশ্চয়ই এশহরে কোন কুখ্যাত অপরাধীর খোঁজে এসেছি। এবং তাই হলে শহরের বর্তমান পরিস্তিতি ভবিষ্যতে পুরোপুরি হুমকির মুখে। অর্থাৎ তোমাদের ধারনা আমার কারণে শহরের কোন ধরনের গন্ডোগোল বাধলে এ শহর পুরোপুুরি তলিয়ে যাবে।’
‘ঠিক তাই, এবং সেরকম কিছু হলে পরিস্তিতি আমাদের মত র্যাঞ্চারদের নিয়ন্ত্রনের বাইর্ েচলে যাবে। ফলে এ শহরটাকে ঠিকিয়ে রাখা...’ মার্টিনকে উঠে দাঁড়াতে দেখে থামল মি.জ্যারি।
‘তোমরা আমাকে শহর ছাড়ার পরামর্শ দিচ্ছো, তাই তো? কিন্তু এই জিনিসটা দেখে কি তোমাদের মনে হয়’ শোল্ডারে ঝোলানো মানিব্যাল্টের দিকে ইঙ্গিত করে বলতে লাগল মার্টিন-‘আমি এখনও পুরাতন পেশায় ঘুরে বেড়াচ্ছি?’
‘কি বলতো চাচ্ছো তুমি?’ চেহারার রসিক ভাবচা উধাও হয়ে সেখানে কিঞ্চিত অসন্তুষ্টির রেখা ফুটে উঠল র্যাঞ্চারের।
‘ভাল করে খোঁজ নিয়ে দেখ আমি বর্তমানে একজন ভবঘুরের চেয়েও জঘন্য অবস্থানে আছি। হ্যাঁ, ক’দিন আগেও ঔই পেশায় ছিলাম, কিন্তু জমানো টাকাগুলো আমাকে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করিয়েছে। সুতরাং, পেশাটা এখন আমার পরিচয় নয়। আশা করি বোঝাতে পেরেছি?’ স্মিত হাসল মার্টিন।
‘বেয়াড়া ছোকরা!’ চাপা নিঃশ্বাস ছাড়ল রবার্টসন।
‘এরমানে এ শহরেই থাকবে বলে স্বীদ্ধান্ত নিয়েছো তুমি?’
‘আলবৎ! এবং সম্বল যা আছে তা দিয়ে একটা কিছু করার ব্যাপারে তোমার সহযোগীতা পাবার |